স্বাস্থ্যখাতে বৈষম্য নিরসন ও বিকেন্দ্রীকরণে বদ্ধপরিকর সরকার : প্রধানমন্ত্রী

স্বাস্থ্যখাতে বৈষম্য নিরসন ও বিকেন্দ্রীকরণে বদ্ধপরিকর সরকার : প্রধানমন্ত্রী

জাতীয় ডেস্ক

দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান শহর-গ্রাম বৈষম্য দূর করতে স্বাস্থ্য খাতের বিকেন্দ্রীকরণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর মানোন্নয়ন ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা সেবা তৃণমূল পর্যায়ে নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি টেকসই ও মানবিক স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

শনিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) সম্মেলন-২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথা জানান। প্রথমবারের মতো আয়োজিত এই সম্মেলনে সারাদেশের পাঁচ শতাধিক উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা অংশগ্রহণ করেন।

সেবা বিকেন্দ্রীকরণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা ও উন্নত ল্যাব সুবিধা বর্তমানে মূলত ঢাকা ও বড় শহরকেন্দ্রিক। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “শহর ও গ্রামাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবায় যে বিস্তর ব্যবধান রয়েছে, তা নিরসন করা আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এটি একদিনে সম্ভব নয়, তবে সরকার ধাপে ধাপে এই লক্ষ্য অর্জনে কাজ করছে।”

তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে অভিহিত করেন। প্রধানমন্ত্রীর মতে, চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘হেলথ কেয়ার ম্যানেজমেন্ট’ এবং ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ম্যানেজমেন্ট’—এই দুটি বিষয়ের যথাযথ সমন্বয় না হলে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সুফল পাবে না। তাই চিকিৎসকদের পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি প্রশাসনিক ও মানবিক গুণাবলি অর্জনের আহ্বান জানান তিনি।

প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও নতুন কর্মসংস্থান
সরকারের স্বাস্থ্যনীতির মূল দর্শন হিসেবে ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’ নীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অসংক্রামক রোগ যেমন—ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ক্রমবর্ধমান প্রকোপ মোকাবিলায় উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত স্ক্রিনিং ও জনসচেতনতা বাড়ানোর নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। বর্তমানে দেশের মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশই অসংক্রামক রোগের কারণে হচ্ছে বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

স্বাস্থ্যসেবাকে আরও আধুনিক ও জনবান্ধব করতে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচএস) আদলে প্রতিটি উপজেলা এবং ক্রমান্বয়ে ইউনিয়নে ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট’ স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য সারাদেশে ধাপে ধাপে এক লক্ষ ‘হেলথ কেয়ারার’ নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার ৮০ শতাংশই হবেন নারী। এই কর্মীরা সরাসরি মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরামর্শ ও সেবা প্রদান করবেন।

ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা ও জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা
প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের মাধ্যমে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে সহজ করতে সরকার শিগগিরই ‘সমন্বিত ই-হেলথ কার্ড’ চালু করতে যাচ্ছে। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্যতথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকবে, ফলে দেশের যেকোনো প্রান্তের হাসপাতালে চিকিৎসকের পক্ষে রোগীর পূর্ব ইতিহাস জেনে চিকিৎসা দেওয়া সহজ হবে। এছাড়া, চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে সাধারণ মানুষ যাতে আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে না পড়ে, সেজন্য ধাপে ধাপে ‘জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা’ ব্যবস্থা চালু করার মহাপরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।

বাজেট বরাদ্দ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা
দেশের স্বাস্থ্য খাতের আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ ক্রমান্বয়ে জিডিপির পাঁচ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে ভবিষ্যতের শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সকল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে নিরাপদ প্রসব ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবার নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

বিগত সময়ে টিকাদান কর্মসূচিতে বিশেষ করে ‘হাম’ প্রতিরোধে যে ব্যর্থতা পরিলক্ষিত হয়েছে, তাকে একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে প্রধানমন্ত্রী ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছে দুঃখপ্রকাশ করেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে।

চিকিৎসকদের প্রতি আহ্বান
চিকিৎসা পেশার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন চিকিৎসকের আন্তরিক ব্যবহার অনেক সময় ওষুধের চেয়েও বেশি কার্যকর। চিকিৎসকদের আবাসন, নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। তবে নিজ নিজ কর্মস্থলকে একটি মডেল সেবা কেন্দ্রে রূপান্তর করার দায়িত্ব চিকিৎসকদেরই নিতে হবে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মোহাম্মদ কামরুজ্জামান চৌধুরী এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাতচন্দ্র বিশ্বাস। অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী জরুরি চিকিৎসাসেবা ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী ছয়জন চিকিৎসকের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেন।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ