আইন ও বিচার ডেস্ক
মামলার জট নিরসন, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার প্রাপ্তি সহজ করতে বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল করার প্রক্রিয়া জোরদার করছে সরকার। দীর্ঘদিনের ধীরগতি এবং প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ লাঘবে এই রূপান্তরকে একটি নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখছেন আইন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সরকারের এই উদ্যোগগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের বিচারিক ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিচার বিভাগের আধুনিকায়নে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, ই-জামিন বন্ড ব্যবস্থাপনা, ই-ফ্যামিলি কোর্ট, অনলাইন কজ লিস্ট বা কার্যতালিকা এবং বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনের ডিজিটালকরণসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ইতোমধ্যে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করেছে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে বিচারপ্রার্থীরা আগের চেয়ে দ্রুত এবং কম খরচে আইনি সেবা পাচ্ছেন।
বিশেষ করে ‘ই-জামিন বন্ড’ ব্যবস্থাপনা দেশের বিচারিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে বড় ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে দেশের নয়টি জেলায় এই ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু রয়েছে। এর ফলে আইনজীবী, কারা কর্তৃপক্ষ এবং মামলাকারী—সবারই সময় ও অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে। আগে জামিননামা জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে যে দীর্ঘসূত্রতা ও ভোগান্তি ছিল, এখন অনলাইনে তা সম্পাদনের মাধ্যমে তা অনেকটাই লাঘব হয়েছে। সরকার পর্যায়ক্রমে এই ব্যবস্থা সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
অন্যদিকে, পারিবারিক বিরোধ নিরসনে ‘ই-ফ্যামিলি কোর্ট’ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে দুটি জেলায় এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যার মাধ্যমে অনলাইনেই মামলা দাখিল, শুনানি এবং নিষ্পত্তি সম্ভব হচ্ছে। এতে ভুক্তভোগীদের বারবার আদালতে সশরীরে উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজন কমছে, যা বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য বিচারিক প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও নিরাপদ করে তুলেছে।
সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে ‘অনলাইন কজ লিস্ট’ বা মামলার অনলাইন কার্যতালিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। আগে মামলার পরবর্তী তারিখ বা বর্তমান অবস্থা জানতে বিচারপ্রার্থীদের হয় সশরীরে আদালতে যেতে হতো, নয়তো মধ্যস্থতাকারীদের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন ঘরে বসেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে মামলার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে অবগত হওয়া যাচ্ছে। তথ্য আদান-প্রদান আরও গতিশীল করতে দেশের সব চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ‘তথ্য ও সেবা কেন্দ্র’ স্থাপন করা হয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে বিচারপ্রার্থীরা শুনানির প্রস্তুতি ও মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তা পাচ্ছেন।
সামাজিক স্বচ্ছতা ও জালিয়াতি রোধে বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন ডিজিটালাইজেশন করার পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করা হয়েছে। সিভিল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস (সিআরভিএস) উদ্যোগের অধীনে ১০টি জেলার ১০২টি ইউনিয়নে প্রাথমিকভাবে এই কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। এর ফলে ভুয়া কাবিননামা বা তথ্য বিকৃতির মাধ্যমে সৃষ্ট পারিবারিক বিরোধ ও আইনি জটিলতা উল্লেখযোগ্য হারে কমবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই সব খণ্ড খণ্ড উদ্যোগের মূল চালিকাশক্তি হলো প্রস্তাবিত ‘ই-জুডিশিয়ারি’ প্রকল্প। এই প্রকল্পের আওতায় মামলা দায়ের থেকে শুরু করে রায় প্রদান এবং নথি সংরক্ষণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা হবে। বর্তমানে প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের বড় চ্যালেঞ্জ—বিচারাধীন মামলার জট—বিস্ময়করভাবে কমে আসবে।
তবে প্রযুক্তিবিদ ও আইন বিশ্লেষকদের মতে, এই ডিজিটাল বিপ্লবের সাফল্য নির্ভর করবে এর কার্যকর বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর। বিশেষ করে প্রান্তিক পর্যায়ের জনগণের প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা এবং নতুন এই ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে জনগণের দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাই নির্ধারণ করবে আগামীর স্মার্ট বিচার বিভাগ কতটা সফল হবে। সরকারের লক্ষ্য হলো একটি সাশ্রয়ী, স্বচ্ছ এবং দ্রুত বিচারিক কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি নাগরিক সময়মতো ন্যায়বিচার পাবেন।


