রাজনীতি ডেস্ক
ঝিনাইদহ শহরে ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টির (এনসিপি) অন্যতম শীর্ষ নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে শহরের পুরাতন ডিসি কোর্ট সংলগ্ন জেলা কালেক্টরেট মসজিদের সামনে এই ঘটনা ঘটে। এ সময় এনসিপির কয়েকজন স্থানীয় নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। ঘটনার পর ফেসবুকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বিএনপি নেতা রাশেদ খাঁন এই হামলার তীব্র নিন্দা জানানোর পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও দলীয় সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের এনসিপিতে যোগদান কর্মসূচিতে অংশ নিতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী গতকাল শুক্রবার ঝিনাইদহ সফরে যান। জুমার নামাজের আগে তিনি শহরে পৌঁছান এবং জেলা কালেক্টরেট মসজিদে নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহম্মেদ তার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও কথা বলতে এগিয়ে যান। কথোপকথনের একপর্যায়ে পেছন থেকে একদল যুবক হঠাৎ তাদের ওপর ডিম নিক্ষেপ করে এবং লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালায়। হামলার আকস্মিকতায় এনসিপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং কয়েকজন সামান্য আহত হন।
হামলার ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে বিএনপি নেতা রাশেদ খাঁন স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, হামলার সময় ঝিনাইদহ-২ (সদর) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতা আলী আজম মোঃ আবু বকর কিংবা ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম কেউই নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে উদ্ধারে বা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে আসেননি।
ফেসবুক পোস্টে রাশেদ খাঁন উল্লেখ করেন, ঘটনাস্থলটি ছাত্রশিবিরের সভাপতির এলাকা হিসেবে পরিচিত এবং ঘটনা সম্পর্কে স্থানীয় জামায়াত-শিবির নেতৃত্বকে তাৎক্ষণিকভাবে অবহিত করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে ন্যূনতম উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তিনি দাবি করেন, শুরুতে শিবিরের কিছু কর্মী ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও পরবর্তীতে সম্ভবত শীর্ষ নেতাদের নির্দেশনায় তারা সেখান থেকে সরে দাঁড়ান। এছাড়া ঘটনার সময় এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা তারেক রেজার কয়েকজন সহযোগী ও অল্পসংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত থাকলেও তাদের ভূমিকা নিয়েও রহস্য তৈরি হয়েছে। তারেক রেজার এই নীরবতাকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর পূর্ববর্তী কিছু রাজনৈতিক বক্তব্যের দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন রাশেদ খাঁন।
এদিকে হামলার পর নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটি লাইভ ভিডিওতে ঘটনাস্থলটিকে ‘আইনমন্ত্রীর এলাকা’ বলে উল্লেখ করেন। এনসিপি নেতার এই দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বলে আখ্যায়িত করেছেন রাশেদ খাঁন। তিনি ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক সীমানা স্পষ্ট করে জানান, বর্তমান আইনমন্ত্রীর নির্বাচনী আসন ঝিনাইদহ সদর নয়, বরং তিনি শৈলকূপা আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, যা ঝিনাইদহ সদর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
ঝিনাইদহের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে বিএনপি নেতা জানান, জেলার মোট চারটি সংসদীয় আসনের মধ্যে তিনটিই বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে কিছু কৌশলগত ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে দল দুটির সম্পর্ক স্থিতিশীল এবং তা কোনো সংঘর্ষের পর্যায়ে নেই। রাশেদ খাঁনের আশঙ্কা, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঝিনাইদহের এই শান্ত রাজনৈতিক পরিবেশকে অশান্ত করার এবং দেশব্যাপী বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে একটি কৃত্রিম সংঘাত ও দূরত্ব তৈরি করার উদ্দেশ্যে এই সফর করেছিলেন। তিনি জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের এই ধরনের উসকানিমূলক ফাঁদে না পড়ার জন্য আহ্বান জানান।
বিবৃতির সমাপ্তিতে রাশেদ খাঁন দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক মিথ্যাচার, চরিত্রহনন, গালিগালাজ এবং সাংঘর্ষিক রাজনীতি কারও জন্যই কল্যাণ বয়ে আনবে না। নতুন বাংলাদেশ গঠনে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক সহনশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন। স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাটি খতিয়ে দেখছে এবং শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।


