আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভার নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে ইরান যুদ্ধ সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবের ওপর পূর্বনির্ধারিত ভোটাভুটি বাতিল করেছে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি। মূলত ভোটাভুটিতে পরাজয়ের আশঙ্কা থেকে শাসক দল এই পদক্ষেপ নিয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। বিরোধী দল ডেমোক্র্যাট পার্টির আইনপ্রণেতারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এককভাবে যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা সীমিত করার উদ্দেশ্যে এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিলেন। একই সঙ্গে প্রস্তাবটিতে প্রশাসনের সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করা হয়েছিল।
প্রস্তাবটি মার্কিন সংসদের নিম্নকক্ষে উত্থাপন করেন নিউইয়র্ক থেকে নির্বাচিত ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি গ্রেগরি মিকস, যিনি প্রতিনিধি পরিষদের বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির একজন অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য। অধিবেশন চলাকালে রিপাবলিকান পার্টির আইনপ্রণেতাদের একটি বড় অংশ অনুপস্থিত থাকায় ট্রাম্পপন্থী সদস্যরা ভোটাভুটি নিয়ে তীব্র আপত্তি তোলেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হাউসের কার্যপ্রণালী অনুযায়ী ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া স্থগিত ঘোষণা করা হয়।
এই সিদ্ধান্তের পর মার্কিন রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদের তিন শীর্ষ ডেমোক্র্যাট নেতা— মাইনোরিটি লিডার হাকিম জেফ্রিস, হুইপ ক্যাথরিন ক্লার্ক এবং ককাস চেয়ার পিট অ্যাগুইলার যৌথ বিবৃতিতে এই ভোট বাতিলের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তারা অভিযোগ করেন, বর্তমান রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস দেশের আইনসভার স্বাধীন মর্যাদা বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বা সহযোগী শাখার মতো আচরণ করছে।
বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়, রিপাবলিকানরা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোলিউশন’ বা যুদ্ধ ক্ষমতা সংক্রান্ত প্রস্তাবের ওপর ভোট গ্রহণ এড়াতে কাপুরুষোচিতভাবে সেটি প্রত্যাহার করেছে। ডেমোক্র্যাট নেতাদের মতে, প্রস্তাবটি উত্থাপিত হলে তা উভয় দলের (দ্বিদলীয়) বিপুল সমর্থনে পাস হতো, যা প্রকারান্তরে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে মধ্যপ্রাচ্য বা পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে সংঘাত সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করতো। তবে প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ও রিপাবলিকান নেতা মাইক জনসন জানিয়েছেন, প্রস্তাবটি পুরোপুরি বাতিল করা হয়নি, আগামী জুন মাসে এই বিষয়ে পুনরায় ভোটাভুটি হতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৩ সালের ঐতিহাসিক ‘যুদ্ধ ক্ষমতা আইন’ (ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট) অনুযায়ী, কংগ্রেসের পূর্ব অনুমোদন ব্যতিরেকে কোনো দেশের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু হলে, তা পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ ৬০ দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বলবৎ থাকে। বর্তমান ইরানের ক্ষেত্রেও এই আইনটি কার্যকর। এই নিয়মানুযায়ী, প্রেসিডেন্ট তার বিশেষ ক্ষমতাবলে পেন্টাগনকে দিয়ে ৬০ দিন পর্যন্ত সামরিক পদক্ষেপ চালিয়ে যেতে পারেন। পরবর্তীতে সেনা প্রত্যাহারের জন্য আরও অতিরিক্ত ৩০ দিন সময় পাওয়া যায়। কিন্তু এই নির্ধারিত সময়ের পর নতুন করে বা দীর্ঘমেয়াদে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে হলে মার্কিন প্রশাসনের জন্য যুদ্ধের যৌক্তিকতা, তথ্য-পরিসংখ্যান ও কৌশলগত বিবরণী পেশ করে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নেওয়া সাংবিধানিকভাবে বাধ্যতামূলক।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামক একটি বিশেষ সামরিক অভিযান শুরু করে। মার্কিন অভ্যন্তরীণ আইন মেনে অভিযান শুরুর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছিল। তবে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসায় ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে নতুন করে বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে প্রতিরক্ষা দপ্তরের বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
পেন্টাগনের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাব মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি স্বয়ং ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির বেশ কয়েকজন সিনেটর এবং প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নতুন করে এই সামরিক অভিযান দীর্ঘায়িত করার বিরোধিতা করছেন। এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসন এখনো যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য কংগ্রেসের কোনো বৈধ অনুমোদন গ্রহণ করেনি, যা মার্কিন আইনসভায় নির্বাহী বিভাগ ও আইনবিভাগের মধ্যে এক বড় ধরনের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জন্ম দিয়েছে। আসন্ন জুন মাসের অধিবেশনে এই বিলটি পুনরায় উত্থাপিত হলে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি এবং রাষ্ট্রপতির যুদ্ধ ক্ষমতার পরিধি নির্ধারণে অত্যন্ত নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।


