ঐকমত্য ছাড়াই শেষ হলো পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি পর্যালোচনা সম্মেলন

ঐকমত্য ছাড়াই শেষ হলো পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি পর্যালোচনা সম্মেলন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ ও নিরস্ত্রীকরণের বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দীর্ঘ চার সপ্তাহের নিবিড় আলোচনার পরও কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মেলন। গত শুক্রবার (২২ মে) চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তাব গ্রহণে ব্যর্থতার মাধ্যমে সম্মেলনের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। নতুন করে বৈশ্বিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে এই ব্যর্থতা আন্তর্জাতিক পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ প্রচেষ্টাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

সম্মেলনের সভাপতি ভিয়েতনামের প্রতিনিধি দো হুং ভিয়েত জানান, প্রতিনিধিদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সম্মেলনটি মূল বিষয়ের ওপর কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়নি। ফলে চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তাবটি গ্রহণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করার কোনো সুযোগ ছিল না। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে প্রভাবশালী দেশগুলোর পারস্পরিক দ্বিমত ও কৌশলগত অবস্থানের কারণেই মূলত দীর্ঘ চার সপ্তাহের এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।

পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের মূল ভিত্তি হিসেবে পরিচিত পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটি (Non-Proliferation Treaty)-র এটি টানা তৃতীয় ব্যর্থতা। এর আগে ২০১৫ এবং ২০২২ সালের পর্যালোচনা সম্মেলনগুলোও কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত বা ঐকমত্য ছাড়াই শেষ হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপর্যুপরি তিনবার বৈশ্বিক এই পুনর্মূল্যায়ন সম্মেলন ব্যর্থ হলেও চুক্তিটি আন্তর্জাতিকভাবে বহাল থাকছে, তবে বারবার সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারায় এর কার্যকারিতা এবং নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশে হ্রাস পাচ্ছে।

চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং বিভিন্ন দেশের অস্ত্র বিস্তারের বাস্তবতার সঙ্গে এই আলোচনার প্রস্তাবিত নীতিমালার দূরত্ব বাড়ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় পরমাণু সমৃদ্ধ দেশগুলোর অনমনীয় অবস্থান এই স্থবিরতার প্রধান কারণ।

সম্মেলনের চূড়ান্ত খসড়া নথিতে একাধিক ভূ-রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে তীব্র মতবিরোধ দেখা যায়। খসড়ায় ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার আহ্বান জানানো হলেও, সেটি ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত ও বন্ধনীযুক্ত অংশ, যা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার গভীর অনৈক্যের ইঙ্গিত দেয়। অপরদিকে, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগ এবং কোরীয় উপদ্বীপের নিরস্ত্রীকরণের যে আহ্বান প্রাথমিক আলোচনায় ছিল, চূড়ান্ত খসড়া থেকে তা পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে পরাশক্তিগুলোর অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক আলোচনা প্রক্রিয়ায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার সীমিত রাখার একমাত্র কার্যকর চুক্তি ‘নিউ স্টার্ট’-এর মেয়াদ গত ফেব্রুয়ারিতে শেষ হয়েছে। এবারের সম্মেলনে ওয়াশিংটন ও মস্কোকে এই চুক্তির বিকল্প খোঁজার বা নতুন আলোচনায় বসার যে সরাসরি আহ্বান জানানো হয়েছিল, তাও শেষ মুহূর্তের খসড়া থেকে বাদ পড়ে।

সর্বশেষ শিথিল করা খসড়াটিতেও রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক পরীক্ষা পুনরায় শুরু করার ঝুঁকি, পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার বৃদ্ধি এবং পারমাণবিক অবকাঠামোর ওপর সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা নিয়ে সতর্কবার্তা অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু চূড়ান্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে সেই ন্যূনতম সতর্কতামূলক নথিটিও গৃহীত হয়নি। এই ব্যর্থতার ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কৌশলগত স্থিতিশীলতা ব্যাহত হওয়ার এবং পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতায় পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ