অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
দেশের চলমান সংকটপূর্ণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে ‘রিকভারি ও রিকনসিলিয়েশন’ (পুনরুদ্ধার ও সমন্বয়) নামে একটি বিশেষ প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এই মেগা প্রকল্পের মূল লক্ষ্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা। একই সঙ্গে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন (১ লক্ষ কোটি) ডলারে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
শনিবার (৬ জুন) রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত ‘সংকট মুহূর্তের বাজেট ২০২৬-২৭’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সরকারের এই পরিকল্পনার কথা জানান। বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার বিভিন্নমুখী নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রস্তাবিত ৬০ হাজার কোটি টাকার ‘রিকভারি ও রিকনসিলিয়েশন’ প্রকল্পটি দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি এবং রাজস্ব ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই তহবিলের সঠিক ব্যবহার দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে এই বিশাল অঙ্কের অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং এর স্বচ্ছ বাস্তবায়নই সরকারের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে।
অর্থনৈতিক রূপান্তরের পাশাপাশি সামাজিক খাতের উন্নয়নেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। অর্থ উপদেষ্টা জানান, দেশের আধুনিক স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বস্তরের জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে একটি ‘জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থার আওতায় দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসাপ্রাপ্তি সহজ ও সাশ্রয়ী করতে প্রয়োজনীয় আইনি ও কাঠামোগত পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলছে।
গোলটেবিল আলোচনায় দেশের অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। আলোচকেরা টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত এবং বাস্তবমুখী বাজেট প্রণয়নের তাগিদ দেন। বিশেষ করে, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং প্রান্তিক কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় কৃষি খাতে সরকারি অর্থায়ন ও ভর্তুকি বাড়ানোর দাবি জানানো হয়।
বিশেষজ্ঞরা দেশের শিল্প খাতের বিকাশের অনুকূলে একটি শিল্পবান্ধব বাজেট প্রণয়নের ওপর জোর দেন। এ ছাড়া জ্বালানি খাতের সংকট, তেল ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানের আহ্বান জানানো হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় বাজেটে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।
আলোচনায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রধান উৎস—রেমিট্যান্সপ্রবাহ বৃদ্ধি এবং আমদানি-রপ্তানি খাতের বিদ্যমান শুল্ক ও নীতিগত প্রতিবন্ধকতা দূর করার তাগিদ দেওয়া হয়। বক্তারা উল্লেখ করেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বৈধ পথে রেমিট্যান্স আনা সহজ করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে। সার্বিকভাবে, সংকটকালীন এই পরিস্থিতিতে কেবল ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো নয়, বরং বাজেটের গুণগত বাস্তবায়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমেই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব বলে গোলটেবিল বৈঠক থেকে অভিমত ব্যক্ত করা হয়।


