অপরাধ ডেস্ক
জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় নয়জনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আজ সোমবার (৮ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এই মামলার সূচনা বক্তব্য (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) উপস্থাপন ও সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মহিতুল হক এনাম চৌধুরী। মামলার নির্ধারিত কার্যসূচি অনুযায়ী, আজ প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে মামলার অভিযোগের সপক্ষে প্রাথমিক রূপরেখা ও সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করার কথা রয়েছে। এরপরই মামলার প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
আইনজীবী ও আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই মামলায় নামধারী ২৮ জন আসামির মধ্যে চারজন বর্তমানে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা হলেন— নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানা শাখার সাবেক সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সাবেক সহসভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, ওমর ফারুক ও ফজলে রাব্বি। বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কারাগার থেকে এই চার আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, মামলার প্রধান দুই অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর কবির নানক ও শেখ ফজলে নূর তাপসসহ ২৪ জন আসামি এখনও পলাতক রয়েছেন। পলাতক আসামিদের তালিকায় তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত আছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার এবং এডিসি রওশুনুল হক।
এছাড়া অন্যান্য পলাতক আসামিদের মধ্যে রয়েছেন— এমএ সাত্তার, তোফায়েল, তারেকুজ্জামান, আরিফুর রহমান তুহিন, আহাদ হোসাইন, মো. ইউনূস, মোল্লা রুবেল, আজিজুল হক, রিয়াজ মাহমুদ, হৃদয়, মাইনুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান, জহির উদ্দিন, আয়মান, সেন্টু মিয়া এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সৈয়দ হাসান নূর ইসলাম রাষ্ট্রন।
মামলার নথিসূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান দমনে তৎকালীন সরকারের দমনপীড়নের অংশ হিসেবে মোহাম্মদপুর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা যৌথভাবে সাধারণ মানুষের ওপর চড়াও হয়। ওই সময় পুলিশের গুলিতে এবং ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নয়জন বিক্ষোভকারী নিহত হন। সরকারের পতনের পর এই নৃশংসতাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়। তদন্ত সংস্থার প্রাথমিক প্রতিবেদনে আসামিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও মাঠপর্যায়ে অপরাধ সঙ্ঘটনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল এই মামলাটি আমলে নেন।
আইনি বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে ট্রাইব্যুনালে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে মোহাম্মদপুরের এই হত্যাকাণ্ডটি অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করছে। যেহেতু এই মামলায় তৎকালীন নীতিনির্ধারক পর্যায়ের মন্ত্রী, সিটি মেয়র এবং পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা অভিযুক্ত, তাই এর বিচারিক প্রক্রিয়া দেশে আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। প্রসিকিউশন টিমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার সত্যতা প্রমাণে পর্যাপ্ত প্রমাণ ও সাক্ষী তাদের কাছে রয়েছে এবং তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারিক কাজ শেষ করতে বদ্ধপরিকর। পলাতক আসামিদের হাজির করতে ইতোমধ্যে আইনগত প্রক্রিয়া ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির মতো পদক্ষেপগুলো সক্রিয় রয়েছে।


