নজিরবিহীন উত্তেজনা: ইরান থেকে ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের নতুন মোড়

নজিরবিহীন উত্তেজনা: ইরান থেকে ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের নতুন মোড়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের ছায়াযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে আবারও সরাসরি ও তীব্র সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে ইরান ও ইসরায়েল। ইসরায়েলি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ইরান থেকে নতুন করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। এই হামলার পর সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রগুলো তাদের আকাশসীমায় প্রবেশের পূর্বেই শনাক্ত করা হয়েছে। সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি ও হুমকি মোকাবিলায় দেশটির সর্বাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে এবং বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে। তবে এই হামলার ফলে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো বিবরণ পাওয়া যায়নি। হামলার পর পরই ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয় এবং নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এই ঘটনার সূত্রপাত ঘটে লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সাম্প্রতিক স্থল ও বিমান অভিযানের মধ্য দিয়ে। ইরান সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলের তীব্র আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় রবিবার রাতে ইসরায়েলের একাধিক কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে বড় ধরনের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র অভিযান চালায় ইরান। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে এই অভিযানের দায় স্বীকার করেছে। আইআরজিসি স্পষ্ট জানিয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলের ধারাবাহিক আগ্রাসন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করার জবাবেই এই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। একই সাথে তারা সতর্ক করেছে যে, ইসরায়েল বা তার মিত্ররা যদি পুনরায় কোনো পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ নেয়, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় এবং বিধ্বংসী হামলার মুখোমুখি হতে হবে।

ইরানের এই হামলার পরপরই পাল্টা জবাব দেয় ইসরায়েল। ইসরায়েলি বিমানবাহিনী ইরানের অভ্যন্তরে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইসফাহান এবং তাবরিজ শহরে বিমান হামলা চালায়। ইসফাহান শহরটি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং প্রধান সামরিক ঘাঁটিগুলোর জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে পরিচিত। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, হামলার সময় ওইসব এলাকায় একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় থাকার কারণে সৃষ্ট আলো দেখা গেছে। যদিও ইরান দাবি করেছে, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফলভাবে শত্রুর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণ নিরাপদ রয়েছে।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের এই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংঘাতের প্রভাব সমগ্র বিশ্ব রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ লাইন বিঘ্নিত হতে পারে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এক লাফে অনেকটাই বাড়িয়ে দিতে পারে। জাতিসংঘসহ বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানালেও, মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। লেবানন ও সিরিয়া সীমান্ত পেরিয়ে এই সংঘাত এখন সরাসরি দুই দেশের মূল ভূখণ্ডে রূপ নেওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক দীর্ঘমেয়াদি ও অনিশ্চিত সংকটের সৃষ্টি হলো, যা অত্র অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলতে পারে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ