নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুর মাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ

নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুর মাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ

অপরাধ ও আইন ডেস্ক

নাটোর আধুনিক ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুই বছর বয়সী এক শিশুর মাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে হাসপাতালেরই তিন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর (সুইপার) বিরুদ্ধে। ঘটনার সময় পুরো চিত্র মুঠোফোনে ধারণ করে পরবর্তীতে তা ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগীকে হুমকি দেওয়া হয় বলেও জানা গেছে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর ভুক্তভোগী নারীর স্বামী বাদী হয়ে নাটোর সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। সরকারি হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল ও সুরক্ষিত স্থানে এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হওয়ায় রোগী এবং তাদের স্বজনদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক, উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

মামলার এজাহার ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত ৫ জুন অসুস্থ দুই বছর বয়সী কন্যাসন্তানকে নাটোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করান এক দিনমজুর দম্পতি। গত ৭ জুন সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি ওষুধ দেওয়ার কথা বলে ভুক্তভোগী নারীকে ডেকে নেন হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী অমিত (২৩)। সরল বিশ্বাসে ওই নারী অমিতের সাথে হাসপাতালের ষষ্ঠ তলায় যান। সেখানে আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন অনিল (২৩) ও প্রাঙ্গন (২৪) নামের আরও দুই পরিচ্ছন্নতাকর্মী। ষষ্ঠ তলার নির্জন স্থানে অনিল ও প্রাঙ্গনের সহায়তায় অমিত ওই নারীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন। এই সময় অন্য দুই অভিযুক্ত পুরো ঘটনাটি মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করেন এবং বিষয়টি কাউকে জানালে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন।

এদিকে, ওয়ার্ডে শিশুকে দীর্ঘক্ষণ একা রেখে মা নিখোঁজ থাকায় এবং শিশুর কান্নাকাটিতে হাসপাতালের নার্স ও কর্মচারীদের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। কর্তব্যরত নার্সরা ভুক্তভোগীর সন্ধান না পেয়ে হাসপাতালের ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা পর্যবেক্ষণ করেন। সিসিটিভি ফুটেজে সন্দেহজনক চলাচল দেখে হাসপাতালের আনসার সদস্যদের বিষয়টি জানানো হয়। খবর পেয়ে আনসার সদস্যরা দ্রুত হাসপাতালের ষষ্ঠ তলার সিঁড়ি সংলগ্ন এলাকা থেকে ভুক্তভোগী নারীকে উদ্ধার করেন এবং তিন অভিযুক্তকে আটক করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিকট হস্তান্তর করেন।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধারকারী আনসার সদস্য মো. সালাউদ্দিন জানান, নার্সদের কাছ থেকে তথ্য পেয়ে তারা পুরো হাসপাতালে তল্লাশি শুরু করেন। পরবর্তীতে ষষ্ঠ তলায় গিয়ে ভুক্তভোগী ও অভিযুক্তদের পাওয়া যায়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্তরা ঘটনাটি অস্বীকার করতে চাইলেও ভুক্তভোগী নারীর জোরালো প্রতিবাদের মুখে তারা অপরাধের কথা স্বীকার করে। হাসপাতালের আনসার প্লাটুন কমান্ডার মো. মন্নাফ হোসেন জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী এবং অভিযুক্তদের প্রাথমিক বক্তব্য সংবলিত ভিডিও রেকর্ড তারা সংরক্ষণ করেছেন।

এই ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ঘটনাটি জানার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভুক্তভোগী পরিবারটিকে আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করে এবং অভিযুক্তদের পুলিশে সোপর্দ না করে কেবল মৌখিকভাবে শাসিয়ে ছেড়ে দেয়। পরবর্তীতে ৮ জুন ভুক্তভোগীর স্বামী হাসপাতালে এসে বিষয়টি জানতে পারেন এবং ৯ জুন মঙ্গলবার সকালে নাটোর সদর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে, অভিযুক্ত তিন পরিচ্ছন্নতাকর্মীই আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হাসপাতালে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ পেয়েছিলেন।

হাসপাতাল চত্বরে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা এবং অভিযুক্তদের ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে নাটোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আরশেদ আলী ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেন। তবে ঘটনার পরপরই অভিযুক্তদের কেন পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হলো না, সে বিষয়ে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট বা সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত অনভিপ্রেত এবং তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার বিষয়ে পুলিশ অত্যন্ত তৎপর রয়েছে। নাটোর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুনসুর রহমান জানান, ভুক্তভোগীর স্বামীর লিখিত অভিযোগটি নিয়মিত মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে এবং বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে।

নাটোরের পুলিশ সুপার মো. শরীফুল হক এই প্রসঙ্গে বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে মামলা রুজু হয়েছে এবং অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

জনাকীর্ণ একটি সরকারি হাসপাতালে দিনদুপুরে এই ধরনের ঘটনা দেশের চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে নজরদারির অভাবকে পুনরায় আলোচনায় এনেছে। স্থানীয় সচেতন মহল ও মানবাধিকার কর্মীরা অবিলম্বে অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং হাসপাতালের নিরাপত্তা জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন।

আইন আদালত শীর্ষ সংবাদ