তিস্তা প্রকল্পে চীনের কারিগরি সহায়তার আশ্বাস, নদীর টেকসই ব্যবস্থাপনায় যৌথ উদ্যোগের সিদ্ধান্ত

তিস্তা প্রকল্পে চীনের কারিগরি সহায়তার আশ্বাস, নদীর টেকসই ব্যবস্থাপনায় যৌথ উদ্যোগের সিদ্ধান্ত

জাতীয় ডেস্ক

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং বিশেষ করে তিস্তা নদী মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নদীভাঙন রোধ, সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং নৌ-নেভিগেশনের উন্নয়নে চীনের কারিগরি ও কৌশলগত সহায়তা চাওয়া হলে বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া দেওয়া হয়েছে। পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি বন্যা ঝুঁকি মোকাবিলায় দুই দেশের এই যৌথ উদ্যোগকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক ও পানি বিশেষজ্ঞরা।

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) চীনের স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায় (বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টায়) বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় দিয়াওইউতাই অতিথি ভবনে সফররত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোওইংয়ের এই আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়, বিশেষ করে অভিন্ন ও আঞ্চলিক নদীগুলোর টেকসই ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের ভূ-প্রাকৃতিক বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে বলেন, দেশের কৃষি, অর্থনীতি এবং জলবায়ুগত সুরক্ষায় নদীগুলোর ভূমিকা অপরিসীম। বর্তমানে বাংলাদেশে বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলা, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং পানিসম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী ব্যাপক আকারে নদী খনন কর্মসূচি চলমান রয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুরক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’ বাস্তবায়নে চীন সরকারের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রত্যাশা করেন তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নদীভাঙন রোধ, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং অভ্যন্তরীণ নৌ-পথের নাব্য বৃদ্ধিতে চীনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

বাংলাদেশের এই প্রস্তাব ও প্রত্যাশার জবাবে চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোওইং অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেন। তিনি পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং বাংলাদেশের পানি খাতের টেকসই উন্নয়নে বেইজিংয়ের সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। চীনের মন্ত্রী ২০০৫ সালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)-এর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, দুই দেশের মধ্যে পানিসম্পদ খাতে বিদ্যমান সহযোগিতা সম্পূর্ণ বাস্তবভিত্তিক এবং গবেষণানির্ভর। এরই অংশ হিসেবে গত বছর চীনের উচ্চপর্যায়ের পানি বিশেষজ্ঞদের একটি দল বাংলাদেশ সফর করে মাঠপর্যায়ের উপাত্ত সংগ্রহ ও কারিগরি দিক পর্যালোচনা করেছে।

লি গোওইং আরও উল্লেখ করেন, নদী শাসন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং বৃহৎ অববাহিকা ব্যবস্থাপনায় চীনের দীর্ঘদিনের সফল অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশ চাইলে চীনের এই আধুনিক প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের নদীগুলোর টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে। দ্বিপাক্ষিক এই সহযোগিতাকে আরও বেগবান করতে বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞ এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চীনে উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও যৌথ গবেষণায় অংশ নেওয়ার আনুষ্ঠানিক আহ্বান জানান তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত খরা, অসময়ে বন্যা এবং নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে তিস্তা প্রকল্পের মতো বৃহৎ মহাপরিকল্পনায় চীনের কারিগরি অংশগ্রহণ সম্পন্ন হলে তা দেশের উত্তরাঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং কৃষি উৎপাদনে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

দ্বিপাক্ষিক এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলে আরও উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দীন স্বপন, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। বৈঠকের পর উভয় পক্ষই আশা প্রকাশ করে যে, এই আলোচনার মধ্য দিয়ে ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যকার কূটনৈতিক ও উন্নয়ন অংশীদারিত্বের সম্পর্ক একটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ