জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রামপুরায় দুই হত্যা মামলার রায়: সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রামপুরায় দুই হত্যা মামলার রায়: সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড

আইন আদালত ডেস্ক

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে রাজধানীর রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলি করাসহ দুজনকে হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এছাড়া মামলাটিতে অপর এক আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অন্য একজনকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আজ রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনাল প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন— বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন— ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান। এছাড়া রামপুরা থানার সাবেক উপ-পরিদর্শক (এসআই) তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, আজ বেলা ১১টা ৪৮ মিনিটে ট্রাইব্যুনালে রায়ের আনুষ্ঠানিক পাঠ শুরু হয়। কার্যপ্রক্রিয়ার শুরুতেই প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম আদালতের রায় প্রদানের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের অনুমতি প্রার্থনা করেন। ট্রাইব্যুনালের অনুমতি সাপেক্ষে পরবর্তীতে এই রায় রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

রায়ের শুরুতেই মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অপরাধের বিবরণী ও দায় পড়ে শোনান ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার। এরপর মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা চার্জ পড়ে শোনান বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। সর্বশেষ মূল রায় ও দণ্ডাদেশ ঘোষণা করেন বিচারক প্যানেলের অন্যতম সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ।

মামলা ও আদালত সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামির মধ্যে একমাত্র গ্রেপ্তারকৃত আসামি রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে বেলা ১১টা ৩৫ মিনিটে কড়া নিরাপত্তায় আদালতের এজলাসে হাজির করা হয়। ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ মামলার অপর চার আসামি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। তাদের অনুপস্থিতিতেই এই বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন ও রায় ঘোষণা করা হলো।

মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর রামপুরা এলাকায় ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আক্রমণাত্মক অভিযানের মুখে আমির হোসেন নামের এক তরুণ জীবন বাঁচাতে একটি নির্মাণাধীন ভবনে আশ্রয় নেন। একপর্যায়ে তাকে ভবন থেকে নিচে লাফ দিতে বাধ্য করা হয়। প্রাণভয়ে ওই তরুণ ভবনের কার্নিশের রড ধরে ঝুলে থাকলে তাকে লক্ষ্য করে নির্মমভাবে গুলি চালানো হয়, এতে তার দুই পা গুলিবদ্ধ হয়। একই দিনে রামপুরার বনশ্রী এলাকায় পুলিশি অ্যাকশনে নাদিম ও মায়া ইসলাম নামের আরও দুই ব্যক্তি গুলিতে নিহত হন। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী अपराधের অভিযোগে মামলাটি দায়ের করা হয়।

আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত অপরাধের বিচারে এই রায় একটি বড় মাইলফলক। তৎকালীন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের এই শাস্তি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে একটি কঠোর বার্তা দেবে। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে আইনি তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

আইন আদালত শীর্ষ সংবাদ