জাতীয় ডেস্ক
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আরও শক্তিশালী করা এবং বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষায়িত সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব পিস অপারেশনস (ডিপিও)-এর আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জঁ-পিয়েরে লাক্রোয়া দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন। সোমবার (৬ জুলাই) অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে জাতিসংঘ সদর দপ্তর ও মাঠপর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে বাংলাদেশ পুলিশের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অবদান, দ্রুত নিয়োজন সক্ষমতা যাচাই (আরডিএল ভেরিফিকেশন), কঙ্গোর শান্তিরক্ষা মিশন (মোনুস্কো) থেকে বাংলাদেশি নারী ফর্মড পুলিশ ইউনিট (এফপিইউ) প্রত্যাহারের পর নতুন মিশনে প্রতিস্থাপন এবং জাতিসংঘের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে বাংলাদেশিদের নিয়োগের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। এছাড়া ইন্ডিভিজুয়াল পুলিশ অফিসার (আইপিও) ডেপ্লয়মেন্ট এবং ভবিষ্যৎ বিশেষায়িত সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন প্রায়োগিক বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ পুলিশ জাতিসংঘের একটি দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত অংশীদার। এ পর্যন্ত ২৬টি দেশের ২৭টি শান্তিরক্ষা মিশনে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী। অন্যতম শীর্ষ পুলিশ অবদানকারী দেশ (পিসিসি) হিসেবে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশের পেশাদারিত্ব ও কার্যকারিতা বাড়াতে সরকারের নানামুখী বিনিয়োগ এবং উচ্চতর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ পুলিশের দ্রুত সাড়াদানের সক্ষমতা আরও জোরদার করতে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য দুটি ফর্মড পুলিশ ইউনিটের (এফপিইউ) র্যাপিড ডেপ্লয়মেন্ট লেভেল (আরডিএল) যাচাইকরণের প্রস্তাব ইতোমধ্যে জাতিসংঘ পুলিশ বিভাগে জমা দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত ইউনিট দুটি জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী আধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম (মেজর ইকুইপমেন্ট), নিজস্ব রসদ ব্যবস্থাপনা (সেলফ-সাসটেইনমেন্ট) এবং দক্ষ জনবল দিয়ে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। দ্রুততম সময়ে এই যাচাইকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তিনি ডিপিওর সহযোগিতা কামনা করেন।
বৈঠকে কঙ্গোর মোনুস্কো মিশন থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরে স্বল্প সময়ের নোটিশে ১৮০ সদস্যের বাংলাদেশি নারী এফপিইউ প্রত্যাহারের বিষয়টি বিশেষভাবে উত্থাপন করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকের মিনুসকা বা দক্ষিণ সুদানের ইউনমিস-এর মতো অন্যান্য মিশনে বিভিন্ন দেশের ইউনিট আনুপাতিক হারে কমানো হলেও, কঙ্গো মিশনে শুধু বাংলাদেশের পুরো ইউনিট প্রত্যাহার করা হয়েছে, যা সমতা ও ন্যায্যতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বৈশ্বিক শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবদান বিবেচনায় নিয়ে দক্ষিণ সুদান, আবেয়ি বা সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে একটি নতুন বাংলাদেশি এফপিইউ মোতায়েনের জন্য তিনি জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেলকে অনুরোধ জানান।
শান্তিরক্ষা মিশনের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘ সদর দপ্তর ও বিভিন্ন মিশনের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং বিশেষায়িত পেশাদার পদে (পি-লেভেল ও ডি-লেভেল) যোগ্য বাংলাদেশি পুলিশ কর্মকর্তাদের আরও বেশি সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। শান্তি মিশনের পরিবর্তিত চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ ও যোগ্য পুরুষ ও নারী কর্মকর্তা দিতে বাংলাদেশ সবসময় প্রস্তুত রয়েছে।
বৈঠকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুনে অনুষ্ঠিত সিলেকশন অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট টিম (এসএএটি) পরীক্ষায় ১০৭ জন কর্মকর্তা উত্তীর্ণ হলেও এখনো ৮৫ জন কর্মকর্তা নিয়োগের অপেক্ষায় রয়েছেন। সেন্ট্রাল আফ্রিকান কারিগরি মিশন ও কঙ্গোতে বাংলাদেশি ইন্ডিভিজুয়াল পুলিশ অফিসারের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকায় ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষ অপেক্ষমাণ কর্মকর্তাদের দ্রুত পদায়নের অনুরোধ জানানো হয়। একই সঙ্গে বর্তমান তালিকার মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে আগামী সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশে পরবর্তী এসএএটি পরীক্ষা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে বলে জানানো হয়।
জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জঁ-পিয়েরে লাক্রোয়া বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশি পুলিশ সদস্যদের বীরত্বপূর্ণ অবদান, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের উচ্চ প্রশংসা করেন। তিনি কঙ্গো মিশনের ভারসাম্য ও সমতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আশ্বাস দেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের উত্থাপিত দাবিগুলো পূরণ এবং বিশেষায়িত পুলিশ দল গঠনের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে পূর্ণ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।


