জাতীয় ডেস্ক
বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার বিদ্যমান ঐতিহাসিক ও বহুমাত্রিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে বাংলাদেশের যোগাযোগ অবকাঠামো, বন্দর উন্নয়ন ও সামুদ্রিক অর্থনীতি খাতে ব্রিটিশ বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশি নাবিকদের ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণের বিষয়ে যুক্তরাজ্যের সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার লন্ডনে বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এবং যুক্তরাজ্যের পরিবহন বিষয়ক মন্ত্রী হেইডি আলেকজান্ডারের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের উন্নয়ন এজেন্ডা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং পরিবেশবান্ধব টেকসই যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
বৈঠকের শুরুতে শেখ রবিউল আলম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আন্তরিক শুভেচ্ছা যুক্তরাজ্যের পরিবহন মন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেন। এ সময় তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার জনগণের বিপুল সমর্থনে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও peaceful বা শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। নতুন সরকার দেশে গণতন্ত্র, সুশাসন, জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ।
যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করে মন্ত্রী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে দেশটির ধারাবাহিক সহযোগিতার জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘদিনের অবস্থান তাঁকে সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা এবং আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কে মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দিয়েছে। এই অভিজ্ঞতা বর্তমানে বাংলাদেশের চলমান রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ও সংস্কার কার্যক্রমে ইতিবাচকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক জাহাজে কর্মরত বাংলাদেশি নাবিকদের পেশাগত সমস্যা ও ট্রানজিট সুবিধার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করা হয়। শেখ রবিউল আলম বাংলাদেশি নাবিকদের জন্য ‘ওকে টু বোর্ড’ (ওকেটিবি) এবং অন্যান্য ট্রানজিট ও নাবিক-সংক্রান্ত ভিসা প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজতর করার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের কার্যকর সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই প্রক্রিয়া সহজ হলে আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যে বাংলাদেশি পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ আরও বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশের উদীয়মান ব্লু-ইকোনমি বা সামুদ্রিক অর্থনীতি এবং অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের বিশাল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে নৌপরিবহন মন্ত্রী যুক্তরাজ্যের উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্প, সামুদ্রিক প্রকৌশল, বন্দর উন্নয়ন, আধুনিক সামুদ্রিক পরিবহন ব্যবস্থা এবং বন্দরভিত্তিক শিল্পে অধিকতর ব্রিটিশ বিনিয়োগ, যৌথ উদ্যোগ (জয়েন্ট ভেঞ্চার), প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) সম্প্রসারণের অনুরোধ করেন। একই সাথে তিনি দুই দেশের মধ্যে সামগ্রিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিধি বাড়াতে যৌথভাবে কাজ করার ওপর জোর দেন।
শিপ রিসাইক্লিং বা জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্পের আধুনিকায়নে বাংলাদেশের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বৈঠকে জানানো হয়। মন্ত্রী উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্পে আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে ‘হংকং আন্তর্জাতিক কনভেনশন’ বাস্তবায়নে সম্পূর্ণরূপে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বর্তমানে বাংলাদেশের ৪২টি জাহাজ পুনর্ব্যবহার ইয়ার্ডের মধ্যে ইতোমধ্যে ২৭টি আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট ইয়ার্ডগুলোকে পর্যায়ক্রমে এই বৈশ্বিক মানদণ্ডে উন্নীত করার জন্য সরকারের সুনিরূপিত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কার করে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সমুদ্র চলাচল সংস্থার (আইএমও) জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস-সংক্রান্ত বৈশ্বিক উদ্যোগকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। বাংলাদেশ বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রধান উৎস না হওয়া সত্ত্বেও পরিবেশ রক্ষায় সর্বোচ্চ আন্তরিক। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, সবুজ প্রবৃদ্ধি এবং টেকসই সামুদ্রিক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাংলাদেশ বিশ্ব সম্প্রদায়ের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
বৈঠকে উভয় দেশের মন্ত্রী সড়ক, নৌ ও রেলপথ পরিবহন, বন্দর উন্নয়ন, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্যমান সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে একযোগে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
বৈঠক শেষে বাংলাদেশের সড়ক, রেলপথ ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম যুক্তরাজ্যের পরিবহন মন্ত্রী হেইডি আলেকজান্ডারকে তাঁর সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের জন্য আন্তরিক আমন্ত্রণ জানান। এই বৈঠক দুই দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও সুসংহত করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মহল।


