জাতীয় ডেস্ক
টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে সরকারের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ, উদ্ধার অভিযান এবং পুনর্বাসনের জন্য সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগকবলিত এলাকার সামগ্রিক পরিস্থিতি সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। স্থানীয় জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। একই সাথে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, দ্রুত উদ্ধারকাজ পরিচালনা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম বাস্তবায়নে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সংসদ সদস্যদের সমন্বিতভাবে মাঠে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের গৃহীত প্রথম ও প্রধান পদক্ষেপ হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগের দুর্যোগকবলিত জেলাগুলোতে ইতোমধ্যে ১ হাজার ৫৭টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে এ পর্যন্ত ১২ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। আশ্রয়গ্রহণকারী মানুষের জন্য নিরাপদ খাবার পানি, স্যানিটেশন ব্যবস্থা, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ও তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ করে শিশুখাদ্য সরবরাহের বিষয়ে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করতে সরকারের জেনারেল রিলিফ (জিআর) কর্মসূচির আওতায় জরুরি ভিত্তিতে নগদ অর্থ ও খাদ্যশস্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ৫টি জেলার দুর্গত মানুষের মাঝে বিতরণের জন্য ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা নগদ অনুদান এবং ৩ হাজার ৪৫০ মেট্রিক টন চাল দ্রুততম সময়ে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এই ত্রাণসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
উপকূলীয় ও পাহাড়ি এলাকার ভৌগোলিক সংকটের কারণে উদ্ধার কার্যক্রমে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি থাকায় এবং বন্যা পরিস্থিতি বিবেচনায় সাধারণ মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। সেনাবাহিনী ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা মাঠপর্যায়ে উদ্ধার কাজে স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তা প্রদান করছে।
দুর্যোগের সার্বিক প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষা ও যোগাযোগ খাতের সুরক্ষায় কিছু তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ভারী বর্ষণ, বন্যা ও ভূমিধস পরিস্থিতির কারণে ওই অঞ্চলের চলমান এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর পুনরায় পরীক্ষার নতুন সময়সূচি ঘোষণা করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলপথের জলাবদ্ধতার ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক বন্যায় পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া ৪৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথটি ৫ ফুট উঁচু করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দরপত্র প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এছাড়া, পাহাড়ধসের স্থায়ী ঝুঁকিতে থাকা স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য নিরাপদ স্থানে স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করার প্রক্রিয়াও সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে।
দুর্যোগকবলিত এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়াতে সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিদেরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধিরা প্লাবিত অঞ্চলসমূহ পরিদর্শন করছেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রাখছেন। একই সাথে এই দুর্যোগে যারা হতাহত হয়েছেন, তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানাতে এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে বাড়ি বাড়ি পরিদর্শন করছেন।
সরকারের নীতিগত অবস্থান ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র জানান, প্রাকৃতিক এই সংকট মোকাবিলায় মানবিক প্রয়াস ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। দ্রুততম সময়ে এই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে মাঠপর্যায়ের প্রশাসন থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত সকল বিভাগ একযোগে কাজ করে যাচ্ছে।


