অপরাধ ডেস্ক
চট্টগ্রামের ইপিজেড থানা এলাকায় পাঁচ বছর বয়সী শিশু আলিনা ইসলাম আয়াতকে অপহরণের পর নির্মমভাবে হত্যা ও মরদেহ টুকরো করে সাগরে ভাসিয়ে দেওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় একমাত্র আসামি আবীর আলীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে আসামিকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
বুধবার চট্টগ্রামের ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মুহাম্মদ আলী আক্কাস চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আবীর আলী আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। পরে কঠোর নিরাপত্তা প্রহরায় তাকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
আদালতের নথিসূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ১৪ নভেম্বর চট্টগ্রামের ইপিজেড থানার নয়ারহাট ওয়াছমুন্সী বাড়ি এলাকার বাসিন্দা সোহেল রানার মেয়ে আলিনা ইসলাম আয়াত নিখোঁজ হয়। নিখোঁজের পর শিশুর পরিবার ইপিজেড থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। ঘটনার ছায়াতদন্তে নেমে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রতিবেশী আবীর আলীকে গ্রেপ্তার করে। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে আবীর স্বীকার করেন যে, মুক্তিপণের উদ্দেশ্যে আয়াতকে অপহরণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে মরদেহ কেটে ছয়টি টুকরো করে সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পিবিআই দীর্ঘ তল্লাশি চালিয়ে সাগরের তলদেশ ও স্লুইসগেট এলাকা থেকে শিশুর দেহাংশ উদ্ধার করে।
রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) জালাল উদ্দিন মামলার রায়ের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, এটি একটি অত্যন্ত বর্বর ও নির্মম হত্যাকাণ্ড ছিল। মামলার রায় ঘোষণার সময় বিচারক তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, ঘটনাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত, নিষ্ঠুর, নৃশংস এবং সমাজে চরম আতঙ্ক সৃষ্টিকারী। শিশু সুরক্ষায় এবং সামাজিক নিরাপত্তায় এই ধরণের অপরাধের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অপরিহার্য। রাষ্ট্রপক্ষ মামলার শুরু থেকেই আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে আইনি লড়াই চালিয়েছে।
ঘটনার তদন্ত শেষে ২০২৩ সালের ৯ অক্টোবর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পরিদর্শক মনোজ কুমার দে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেন। অভিযোগপত্রে আবীর আলীকে একমাত্র আসামি হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। আদালত ২০২৩ সালের শেষভাগে আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠন করে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করেন। বিচার চলাকালীন সময়ে রাষ্ট্রপক্ষ ও আদালত অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে মামলার কার্যক্রম এগিয়ে নেন এবং মোট ৩৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন করেন। দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং উভয় পক্ষের যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত আজ এই চূড়ান্ত রায় প্রদান করলেন।
আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এ ধরনের মামলার দ্রুত বিচার ও কঠোর রায় সমাজে অপরাধ প্রবণতা কমাতে এবং শিশু নির্যাতন রোধে একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে। রায় ঘোষণার পর নিহতের স্বজনরা সন্তোষ প্রকাশ করলেও তারা অনতিবিলম্বে এই রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, আসামি পক্ষের আইনজীবীরা উচ্চ আদালতে আপিল করার বিষয়ে ভাবছেন বলে জানা গেছে।


