নিজস্ব প্রতিবেদক
পদ্মা অববাহিকার বিস্তৃত কৃষিভিত্তিক অঞ্চলকে মরুকরণ ও পানির সংকট থেকে রক্ষা করতে সরকার ‘পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প’ গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন পানি সম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। তিনি বলেন, শুষ্ক মৌসুমে নদীভিত্তিক এলাকায় পর্যাপ্ত পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং কৃষি উৎপাদন স্থিতিশীল রাখতে এ প্রকল্পকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রকল্পটি ২০৩৩ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত উদ্যোগ, যা দেশের মোট ভৌগোলিক আয়তনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করে। এসব অঞ্চলে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি মানুষের বসবাস রয়েছে, যাদের বড় একটি অংশ কৃষি ও নদীনির্ভর জীবিকায় সম্পৃক্ত। ফলে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কৃষি উৎপাদন, সেচ ব্যবস্থা এবং পরিবেশগত ভারসাম্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, নদীনির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা সুরক্ষায় পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পকে একটি জীবনরক্ষাকারী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ হ্রাস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বৃদ্ধি—এই তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রকল্পটি ভূমিকা রাখতে পারে।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের ধারণা নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এ বিষয়ে আলোচনা ও গবেষণা চলমান রয়েছে। ১৯৬০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে মোট চারটি পৃথক সমীক্ষা পরিচালিত হয়, যার মাধ্যমে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রাথমিক মূল্যায়ন করা হয়।
পরবর্তীতে ২০০২ সালে একটি প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষার মাধ্যমে ব্যারেজ নির্মাণের সম্ভাব্য স্থান চিহ্নিত করা হয়। এরপর ২০০৪ সালে ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বিস্তারিত সমীক্ষা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, যা ২০১৩ সালে সম্পন্ন হয়। ওই সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ নকশা প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
মন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণকে একটি অগ্রাধিকারমূলক উন্নয়ন উদ্যোগ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করে ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে।
প্রস্তাবিত ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সাল থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়িত হলে দেশের নদী ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে কৃষি সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ, লবণাক্ততা হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের বিষয়গুলোও যথাযথভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
বর্তমানে প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনা পর্যায়ে রয়েছে। অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে পরবর্তী ধাপে বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ও অর্থায়ন কাঠামো চূড়ান্ত করা হবে বলে জানা গেছে।


