শেয়ার বাজার ডেস্ক
সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবার দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেনের শুরু থেকেই সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এদিন লেনদেনের প্রথম ঘণ্টায় অধিকাংশ সিকিউরিটিজের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৪২ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৫ হাজার ২৯৭ পয়েন্টে অবস্থান করছে। সকাল ১০টায় লেনদেন শুরুর পর থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত প্রথম এক ঘণ্টায় বাজারে মোট ২৬২ কোটি ৭০ লাখ টাকার শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিট হাতবদল হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় স্বাভাবিক নিয়মেই ডিএসইতে লেনদেন শুরু হয়। শুরুর দিকেই ক্রেতাদের আধিক্য থাকায় অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়তে থাকে। তবে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বাজারে কিছুটা বিক্রয়চাপ পরিলক্ষিত হয়, যার ফলে বেশ কিছু শেয়ার সাময়িকভাবে দরপতনের তালিকায় চলে যায়। যদিও এই নিম্নমুখী প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বেলা ১১টার দিকে বাজার পুনরায় ঘুরে দাঁড়ায় এবং অনেকগুলো সিকিউরিটিজ ফের দাম বাড়ার তালিকায় ফিরে আসে। প্রথম ঘণ্টা শেষে ডিএসইতে মোট ৩৯২টি কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিটের লেনদেন সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে ২৮৭টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে, যা দরপতন হওয়া প্রতিষ্ঠানের তুলনায় প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ বেশি। অন্যদিকে, ৫১টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম কমেছে এবং ৫৪টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম অপরিবর্তিত অবস্থায় রয়েছে।
শেয়ারবাজারের সার্বিক পরিস্থিতি নির্দেশক সূচকগুলোর দিকে নজর দিলে দেখা যায়, প্রথম ঘণ্টার লেনদেনে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৪২ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ২৯৭ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। প্রধান সূচকের পাশাপাশি অপর দুটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকেও ইতিবাচক ধারা পরিলক্ষিত হয়েছে। বাজারে মূলধনের দিক থেকে শীর্ষস্থানীয় এবং আর্থিকভাবে শক্তিশালী বাছাই করা ৩০টি কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ১৬ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ১ পয়েন্টে অবস্থান করছে। এছাড়া, ইসলামী শরিয়াহ্ ভিত্তিক পরিচালিত কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী ডিএসই শরিয়াহ্ সূচক (ডিএসইএস) ১১ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৭৭ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। সূচকগুলোর এই সমান্তরাল বৃদ্ধি বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার একটি ইতিবাচক প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
লেনদেনের পরিমাণের দিক থেকেও দিনটির শুরুটা ছিল বেশ আশাব্যঞ্জক। ডিএসইতে প্রথম ঘণ্টায় মোট ২৬২ কোটি ৭০ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর আগের দিন, অর্থাৎ বুধবার পূর্ণ কার্যদিবসে (চার ঘণ্টায়) এক্সচেঞ্জটিতে মোট ৮৩৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকার সিকিউরিটিজ লেনদেন হয়েছিল। সেই তুলনায় বৃহস্পতিবারের প্রথম ঘণ্টার লেনদেনের গতিধারা বজায় থাকলে দিন শেষে মোট লেনদেনের পরিমাণ একটি সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে বাজার সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে শেয়ারবাজারের এই গতিশীলতা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের সুদের হারের ওঠানামা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেলেও, ভালো মৌলভিত্তির শেয়ারের প্রতি তাদের আগ্রহ অব্যাহত রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যখনই বাজারে ফান্ডামেন্টাল শেয়ারের দাম বিনিয়োগযোগ্য পর্যায়ে আসে, তখনই বিনিয়োগকারীরা নতুন করে পোর্টফোলিও সাজাতে শুরু করেন। বৃহস্পতিবার প্রথম ঘণ্টার লেনদেনে ক্রেতাদের যে আধিক্য দেখা গেছে, তা মূলত সেই কৌশলগত বিনিয়োগেরই একটি অংশ।
অন্যদিকে, দেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বাজারে যাতে কোনো ধরনের কারসাজি বা কৃত্রিম উপায়ে শেয়ারের দাম বৃদ্ধির ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদেরও সক্রিয় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। শেয়ারবাজার বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাজারের এই স্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখতে হলে নীতি ধারাবাহিকতা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
বিনিয়োগকারীদের মনস্তাত্ত্বিক দিকটিও শেয়ারবাজারের দৈনন্দিন লেনদেনে বড় প্রভাব ফেলে। সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস হওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী তাদের সাপ্তাহিক পোর্টফোলিও সমন্বয় করে থাকেন। কেউ কেউ সপ্তাহান্তের ছুটির আগে মুনাফা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন, আবার অনেকেই আগামী সপ্তাহের জন্য নতুন শেয়ার কিনে রাখেন। প্রথম ঘণ্টার চিত্রে মুনাফা তুলে নেওয়ার চেয়ে নতুন করে শেয়ার ক্রয়ের প্রবণতাই বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে। দিনশেষে এই ধারা অব্যাহত থাকলে সূচক ও লেনদেন—উভয় ক্ষেত্রেই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ একটি ইতিবাচক অবস্থানে থেকে সপ্তাহ শেষ করতে সক্ষম হবে। তবে শেয়ারবাজার সর্বদা পরিবর্তনশীল এবং ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায়, বিনিয়োগকারীদের যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, লভ্যাংশ প্রদানের ইতিহাস এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন অর্থনীতিবিদরা।


