বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমানের চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমানের চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু

বাংলাদেশ ডেস্ক

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। শুক্রবার সকাল ৬টা ২৫ মিনিটে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৮ বছর। দেশের শীর্ষস্থানীয় একজন আমলার এই অকাল মৃত্যুতে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস এবং সরকারি প্রশাসনিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা (সিনিয়র তথ্য অফিসার) মো. কামাল হোসেন আনুষ্ঠানিকভাবে এই মৃত্যুর সংবাদটি নিশ্চিত করেছেন। জানা যায়, শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটলে গত শনিবার মাহবুবুর রহমানকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি মেডিকেল বোর্ডের অধীনে তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। তবে চিকিৎসকদের সব ধরনের চেষ্টাকে ব্যর্থ করে শুক্রবার ভোরে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

মাহবুবুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের একজন অত্যন্ত মেধাবী, অভিজ্ঞ ও দূরদর্শী কর্মকর্তা। তিনি ১৯৯৪ সালের এপ্রিল মাসে বিসিএস ১৩তম ব্যাচের (কাস্টমস ও এক্সাইজ) ক্যাডার হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। কর্মজীবনের শুরুতে সহকারী কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি তার পেশাগত জীবনের সূচনা করেন। এরপর দীর্ঘ প্রায় তিন দশকের কর্মজীবনে তিনি সততা, দক্ষতা ও নিষ্ঠার সাথে প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তার পেশাগত জীবনের একটি বড় অংশ কেটেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর)। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত তিনি দেশের বিভিন্ন কাস্টম হাউস, কাস্টম এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে ডেপুটি কমিশনার, যুগ্ম কমিশনার এবং অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সাথে নিজের দায়িত্ব পালন করেন। রাজস্ব আহরণ, শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং কাস্টমস প্রশাসনে আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে তার উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও প্রশাসনিক দক্ষতা তাকে সহকর্মীদের মধ্যে বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা এনে দিয়েছিল। পরবর্তীতে প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে পদোন্নতি পেয়ে তিনি সচিব হিসেবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকে তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনা, আমদানি-রপ্তানি নীতি প্রণয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছিলেন। বিশেষ করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার এই সময়ে দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে তার নির্দেশনামূলক ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তার মতো একজন অভিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবান প্রশাসকের আকস্মিক মৃত্যুতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চলমান বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নীতি-নির্ধারণী কার্যক্রমে একটি সাময়িক শূন্যতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সচিব মাহবুবুর রহমানের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। এক আনুষ্ঠানিক শোকবার্তায় মন্ত্রী মরহুমের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। শোকবার্তায় বাণিজ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন, মাহবুবুর রহমান ছিলেন একজন অত্যন্ত দক্ষ, সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সার্বিক কার্যক্রমে তার পেশাদারিত্ব, দায়িত্ববোধ ও সততা অনস্বীকার্য। তার এই অকাল মৃত্যুতে দেশ একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও দেশপ্রেমিক প্রশাসককে হারালো, যে ক্ষতি সহজে পূরণ হওয়ার নয়।

সরকারি প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে কর্মরত একজন সচিবের মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশাসনিক মহলে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। তার মৃত্যুতে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, বিসিএস ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশন এবং তার দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। সহকর্মীরা তাকে একজন নীতিবান, কর্তব্যপরায়ণ এবং জনবান্ধব কর্মকর্তা হিসেবে স্মরণ করছেন।

সরকারি বিধি মোতাবেক এবং পরিবারের সদস্যদের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে মরহুমের জানাজা ও দাফনের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে মাহবুবুর রহমান তার দীর্ঘ কর্মজীবনে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তা প্রশাসনিক অঙ্গনে তার সহকর্মী ও অনুজদের কাছে দীর্ঘকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার মৃত্যুতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা পূরণে সরকার শিগগিরই প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ