এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় ‘নীরব বহিষ্কার’ প্রথা বাতিল

এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় ‘নীরব বহিষ্কার’ প্রথা বাতিল

শিক্ষা ডেস্ক

বাংলাদেশের পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে পরীক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমাতে এবং পরীক্ষার পরিবেশকে অধিকতর শিক্ষার্থীবান্ধব করতে ঐতিহাসিক ‘নীরব বহিষ্কার’ প্রথা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। শনিবার (১৮ এপ্রিল) সচিবালয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভায় এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আসন্ন এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আয়োজিত এই সভায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড, জেলা প্রশাসন, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা সরাসরি এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অংশগ্রহণ করেন।

দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই নিয়ম অনুযায়ী, কোনো পরীক্ষার্থীকে কেন্দ্রে প্রকাশ্য বহিষ্কার করলে যদি আইনশৃঙ্খলার অবনতি বা দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকত, তবেই তাকে ‘নীরব বহিষ্কার’ করা হতো। এক্ষেত্রে পরীক্ষার্থীকে তাৎক্ষণিক কিছু না জানিয়ে পরীক্ষা চালিয়ে যেতে দেওয়া হতো, কিন্তু কেন্দ্র সচিবের গোপনীয় প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তীতে তার ফলাফল স্থগিত বা পরীক্ষা বাতিল করা হতো। শিক্ষা মন্ত্রণালয় মনে করছে, এ পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের ওপর চরম অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপ তৈরি করে, যা আধুনিক শিক্ষা দর্শনের পরিপন্থী।

মতবিনিময় সভায় শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, ১৯৮০ সালের পাবলিক পরীক্ষা আইনে নীরব বহিষ্কারের কোনো বিধান নেই। এটি মূলত ১৯৬১ সালের বোর্ডের একটি পুরনো নীতিমালার অংশ। তিনি বলেন, “পরীক্ষাসংক্রান্ত কোনো বিধিতে অন্যায্য কিছু থাকতে পারে না। বর্তমানে পরীক্ষাকেন্দ্রে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ নেই, তাই এ নীতিমালা এখন অপ্রাসঙ্গিক।” মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, পরীক্ষার্থীরা আনন্দঘন পরিবেশে পরীক্ষা দেবে এবং কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত বিধিনিষেধ তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে না। তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে নীতিমালা সংশোধনের নির্দেশ প্রদান করেন।

মন্ত্রীর নির্দেশনার পরপরই ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার স্বাক্ষরিত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। দেশের সব কেন্দ্র সচিবের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা পরিচালনা সংক্রান্ত নীতিমালা ২০২৬’-এর ২৯ নম্বর অনুচ্ছেদটি সম্পূর্ণ বাতিল করা হলো। ওই অনুচ্ছেদে এতদিন নীরব বহিষ্কারের ক্ষমতা কেন্দ্র সচিবদের প্রদান করা হয়েছিল। এখন থেকে পরীক্ষাকেন্দ্রে কোনো শৃঙ্খলা ভঙ্গ বা অনিয়ম পরিলক্ষিত হলে তা প্রচলিত প্রকাশ্য নিয়মেই নিষ্পত্তি করতে হবে।

শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, নীরব বহিষ্কারের ফলে অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার্থীরা তাদের ত্রুটি সংশোধন করার সুযোগ পেত না এবং ফলাফল প্রকাশের সময় আকস্মিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতো। এই প্রথা বাতিলের ফলে পরীক্ষা পদ্ধতিতে আরও স্বচ্ছতা আসবে। একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থায় সনাতনী শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি সহযোগিতামূলক এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পাবলিক পরীক্ষা আইন ও বোর্ডের নীতিমালাগুলো আধুনিকীকরণের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষা ব্যবস্থায় প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ এবং কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকায় সায়াটিক বা গোপনীয় ব্যবস্থার আর প্রয়োজন নেই। সরকারের এই সিদ্ধান্ত আসন্ন এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের মাঝে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে এবং তাদের স্বাভাবিক সক্ষমতা প্রদর্শনে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ