জাতীয় সংকট মোকাবিলায় ৯ দফা প্রস্তাবনা ও নির্বাচনী রোডম্যাপের দাবি জামায়াতে ইসলামীর

জাতীয় সংকট মোকাবিলায় ৯ দফা প্রস্তাবনা ও নির্বাচনী রোডম্যাপের দাবি জামায়াতে ইসলামীর

রাজনীতি ডেস্ক

দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং জ্বালানি সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ৯ দফা প্রস্তাবনা গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) রাজধানীর আল-ফালাহ মিলনায়তনে আয়োজিত জেলা ও মহানগরী আমীর সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে এসব প্রস্তাব গৃহীত হয়। সম্মেলনে দেশের চলমান সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকারকে সকল অংশীজনকে সাথে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বর্তমান জাতীয় সংকট এককভাবে কোনো পক্ষের পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। সরকারকে দল-মত নির্বিশেষে সকলকে সাথে নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে ‘জুলাই সনদ’ এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন অধ্যাদেশগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বাস্তবায়নের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

নির্বাচনী রোডম্যাপ ও রাজনৈতিক সংস্কার সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাবনায় জামায়াত নেতৃবৃন্দ উল্লেখ করেন, গণভোটের রায়ের পরবর্তী প্রেক্ষাপটে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের হতাশা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই জন-অসন্তোষ ও অনিশ্চয়তা দূর করতে অবিলম্বে একটি বাস্তবসম্মত এবং সুনির্দিষ্ট নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা করার দাবি জানানো হয়। একইসঙ্গে ‘জুলাই সনদ’-এর প্রতিটি ধারা বাস্তবায়নে একটি কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার ওপর বিশেষ জোর দেয় দলটি।

প্রশাসন ও বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে নেতৃবৃন্দ বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে হবে। নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে মেধা ও যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে একটি নিরপেক্ষ ও পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি সন্ত্রাস ও দখলদারিত্ব দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণের দাবি জানানো হয়।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও কৃষি খাত দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট শিল্প উৎপাদন ও কৃষি খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে সম্মেলনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জামায়াতের পক্ষ থেকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—দেশীয় গ্যাস ও কয়লা উত্তোলনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ খাতের আধুনিকায়ন। এছাড়া কৃষিখাতে সারের সংকট নিরসন এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

অর্থনৈতিক সংস্কার ও বাজার নিয়ন্ত্রণ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে বাজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং অর্থ লোপাটের সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো এবং বিদেশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

স্থানীয় সরকার ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট তৃণমূল পর্যায়ে জনসেবা নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানানো হয়েছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতময় পরিস্থিতির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য বজায় রাখা এবং মানবিক সহায়তা জোরদার করার আহ্বান জানান জামায়াত নেতৃবৃন্দ।

সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান পুনরায় উল্লেখ করেন যে, জাতীয় স্বার্থে গৃহীত প্রতিটি পদক্ষেপ বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সম্মেলনে দেশের সকল জেলা ও মহানগরী পর্যায়ের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন, যারা নিজ নিজ অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের এই ৯ দফা প্রস্তাবনা দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং এটি সরকারের ওপর রাজনৈতিক সংস্কার ত্বরান্বিত করার চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

রাজনীতি শীর্ষ সংবাদ