জাতীয় ডেস্ক
বিগত সরকারের আমলের আর্থিক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার ফলে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি জানিয়েছেন, দেশের অর্থনীতিকে স্বনির্ভর করতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে প্রচলিত খাতের বাইরে নতুন শ্রমবাজার ও পর্যটন খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো হবে।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘ইউরোপীয় শ্রমবাজারে ১০ লাখ দক্ষ জনশক্তি: মাস্টারপ্ল্যান (২০২৬-২০৩১) উপস্থাপন এবং প্রবাসীদের রাষ্ট্রীয় অধিকার নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে ইতালবাংলা সমন্বয় উন্নয়ন সমিতি এবং বাংলাদেশের প্রবাসী উন্নয়ন সমিতি।
তথ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান দুটি উৎস হলো তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। বর্তমানে আরএমজি খাত থেকে বছরে প্রায় ৪০-৪২ বিলিয়ন ডলার এবং রেমিট্যান্স থেকে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার আয় হচ্ছে। তবে ক্রমবর্ধমান আমদানিনির্ভর এই অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কেবল এই দুটি খাতের ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেন, “পূর্ববর্তী সরকারের লুটপাটের কারণে ঋণের যে বিশাল বোঝা তৈরি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণে আমাদের কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।”
সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনকে বাস্তবায়ন করতে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির বিকল্প নেই। বিশেষ করে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করতে ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল মেয়াদী যে মাস্টারপ্ল্যান উপস্থাপন করা হয়েছে, তা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি মাইলফলক হতে পারে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বিকল্প উৎস হিসেবে পর্যটন খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, কুয়াকাটা বা কক্সবাজারের মতো প্রাকৃতিক সম্পদকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে পর্যটন খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে। আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো এবং পর্যটকদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিচালক প্রকৌশলী মো. সালাহ উদ্দিন এবং উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আলী মর্তুজা ইউরোপীয় শ্রমবাজারের চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেন। তাঁরা জানান, ইউরোপের উন্নত দেশগুলোর শ্রমবাজারে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশি কর্মীদের ভাষাগত দক্ষতা ও উন্নত কারিগরি প্রশিক্ষণে জোর দিতে হবে। কেবলমাত্র সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, বরং গুণগত মানসম্পন্ন ও দক্ষ কর্মী তৈরি করাই এখন মূল লক্ষ্য। বিদেশে কর্মস্থলে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করাকেও তাঁরা বর্তমান সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বিএনপির সর্ব ইউরোপীয় শাখার আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ ঝিন্টুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে প্রধান বক্তা হিসেবে ‘মাস্টারপ্ল্যান (২০২৬-২০৩১)’ উপস্থাপন করেন ইতালবাংলা সমন্বয় ও উন্নয়ন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শাহ মোহাম্মাদ তাইফুর রহমান ছোটন। তিনি ১০ লাখ দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর কৌশলগত দিকগুলো বিস্তারিত আলোচনা করেন। অনুষ্ঠানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের প্রবাসী সংগঠনের নেতারাও প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে টিকে থাকতে হলে দক্ষ জনবল তৈরির কোনো বিকল্প নেই। তথ্যমন্ত্রীর এই আহ্বান এবং উপস্থাপিত মাস্টারপ্ল্যান সঠিকভবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন গতির সঞ্চার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।


