জাতীয় ডেস্ক
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশে একটি ‘নিউ অর্ডার’ বা নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী এই বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রচলিত সংবিধান হুবহু মেনে চলা বাধ্যতামূলক নয়।
শনিবার রাজধানীর গ্রিনরোডে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের অডিটরিয়ামে আয়োজিত ‘জুলাই চার্টার এবং গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সাংবিধানিক ব্যবস্থা’ শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি এ মন্তব্য করেন।
বিপ্লব বনাম বিদ্রোহের সাংবিধানিক ব্যাখ্যা জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে একটি সফল ‘বিপ্লব’ হিসেবে অভিহিত করে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক সংজ্ঞা অনুযায়ী কোনো আন্দোলন যখন চূড়ান্ত সফলতা পায়, তখন তা বিপ্লব হিসেবে গণ্য হয়। অন্যদিকে ব্যর্থ আন্দোলনকে বিদ্রোহ বলা হয়। যেহেতু জুলাই আন্দোলন সফল হয়েছে, তাই এটি একটি বিপ্লব এবং এর মাধ্যমে পুরাতন রাষ্ট্রকাঠামো বা ‘ওল্ড অর্ডার’ অপসারিত হয়েছে।
তিনি বলেন, “বিপ্লব সফল হলে আগের শাসনব্যবস্থা ও ক্ষমতার কাঠামো অকার্যকর হয়ে যায়। যদিও আমাদের সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়নি এবং ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে, তবুও এই নতুন বাস্তবতায় আমরা তা মানতে আইনত বাধ্য নই।”
জুলাই সনদ ও রাজনৈতিক ঐক্যমত্য ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সুজন সম্পাদক জানান, বিচার, সংস্কার ও নির্বাচনের দাবিতে নাগরিক সমাজ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন করা হয়েছিল। দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে ৩০টির বেশি রাজনৈতিক দলের মধ্যে অন্তত ৮৪টি বিষয়ে ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গণতান্ত্রিক নীতি অনুযায়ী, দুই-তৃতীয়াংশ দলের সমর্থন থাকায় এই সিদ্ধান্তগুলো সর্বজনগ্রাহ্য।
ঐক্যমত্য হওয়া বিষয়গুলোর বিভাজন তুলে ধরে তিনি বলেন, ৮৪টি বিষয়ের মধ্যে ৪৮টি ছিল সরাসরি সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত। বাকি ৩৬টি আইন ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য। রাজনৈতিক দলগুলো এই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে এবং এটিকে ভবিষ্যতের সংবিধানের অংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে।
গণভোট ও জনগণের ইচ্ছা সংবিধান সংস্কারের এই পুরো প্রক্রিয়াটি জনগণের অভিপ্রায়ের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছে বলে সেমিনারে উল্লেখ করা হয়। বদিউল আলম মজুমদার জানান, সংস্কার প্রস্তাবগুলোর ওপর আয়োজিত গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার তাদের রায় দিয়েছেন। যদিও বর্তমান সংবিধানে এ ধরনের প্রক্রিয়ার সরাসরি উল্লেখ নেই, তবুও জনগণের ইচ্ছা ও ব্যাপক রাজনৈতিক ঐক্যমত্যের কারণে এই প্রক্রিয়াটি ঐতিহাসিক ও নৈতিক বৈধতা পায়।
দীর্ঘমেয়াদি পরামর্শ ও বিশেষজ্ঞ মত সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ব্যারিস্টার ইমরান আবদুল্লাহ সিদ্দিক বলেন, জুলাই সনদ ও সংস্কার প্রস্তাবগুলো হঠাৎ করে চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। প্রায় আট মাস ধরে বিভিন্ন সংস্কার কমিশন, বিশেষজ্ঞ এবং সিভিল সোসাইটির সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার ফসল এটি। সব বিষয়ে পূর্ণ ঐক্যমত্য না হওয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভার জনগণের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, যা গণভোটের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে। এই বিপুল জনসমর্থন সংস্কার আদেশগুলোকে সাধারণ আইনের চেয়েও বেশি শক্তিশালী ও বৈধ করেছে।
সেমিনারে অন্যান্যদের মধ্যে আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এমএ মতিন এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবু হেনা রাজ্জাকী বক্তব্য রাখেন। বক্তারা একমত হন যে, ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত এই নতুন বাস্তবতায় রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে সংবিধানের আমূল সংস্কার এবং জুলাই সনদের যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।


