দেশের টেলিকম খাতে অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ

দেশের টেলিকম খাতে অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ডেস্ক

দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের টেকসই উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক ও টাওয়ার অবকাঠামোতে বৃহৎ পরিসরের বিনিয়োগ এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী মনে করেন, বর্তমান গতিতে অবকাঠামো উন্নয়ন অব্যাহত থাকলে কাঙ্ক্ষিত ডিজিটাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে ফাইভ-জি প্রযুক্তির সফল বাস্তবায়ন ও আধুনিক ডিজিটাল সেবার প্রসারে এই বিনিয়োগ অপরিহার্য।

শনিবার (২৫ এপ্রিল) রাজধানীর একটি হোটেলে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত ‘নতুন টেলিকম পলিসি : উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বিটিআরসি চেয়ারম্যান এসব কথা বলেন। সভায় টেলিকম খাতের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং নতুন নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

বিটিআরসি চেয়ারম্যান তার বক্তব্যে দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি সমন্বিত, অংশগ্রহণমূলক ও সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। টেলিকম খাতের অগ্রগতি শুধু হার্ডওয়্যার নির্ভর নয়, বরং সফটওয়্যার ও সিস্টেমভিত্তিক উদ্ভাবনের ওপর জোর দিতে হবে। একই সাথে দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পুঁজির মধ্যে একটি যৌক্তিক ভারসাম্য বজায় থাকে।

টেলিকম খাতকে একটি ‘কানেক্টিভিটি বিজনেস’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, এই শিল্পে এককভাবে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব। এনালগ বা সেকেলে চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক প্রযুক্তিকে আলিঙ্গন করার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তির প্রতিটি বড় উদ্ভাবন বা ‘কোয়ান্টাম লিপ’ উৎপাদনশীলতার মাত্রা বদলে দেয়। তবে নতুন উদ্ভাবনকে উপেক্ষা করে কেবল বিদ্যমান প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

নতুন টেলিকম নীতিমালা প্রণয়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বিটিআরসি চেয়ারম্যান জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তারা অংশীজনদের সাথে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করছেন। বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত গ্রহণের মাধ্যমেই এই নীতিমালার খসড়া তৈরি করা হয়েছে। তিনি বলেন, নীতিমালা নিয়ে সমালোচনা আসতেই পারে এবং তা কাম্য, তবে সেই সমালোচনা অবশ্যই তথ্যভিত্তিক হতে হবে। বিভ্রান্তিকর বা অসত্য তথ্যের ভিত্তিতে মন্তব্য করা হলে তা পুরো শিল্পখাতকে ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে। ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে একটি ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরির মাধ্যমে খাতটির উন্নয়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর টেলিকম ও আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশে রূপান্তরের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তার মূল ভিত্তি হলো শক্তিশালী টেলিকম অবকাঠামো। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের নীতিগত সহায়তা প্রদান করবে।

প্রযুক্তিবিদ সুমন আহমেদ সাবির মূল প্রবন্ধে টেলিকম খাতের বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট এবং বাংলাদেশের সক্ষমতার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ফাইবার অপটিক সংযোগ তৃণমূল পর্যায়ে না পৌঁছালে উচ্চগতির ইন্টারনেটের সুফল সাধারণ মানুষ পাবে না। তাই অবকাঠামো ভাগাভাগি এবং বিনিয়োগের মডেল পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে।

টিআরএনবির সভাপতি সমীর কুমার দের সঞ্চালনায় সভায় স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মাসুদুজ্জামান রবিন। মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেন, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার জটিলতা দূর করা এবং কর কাঠামো সংস্কার করা গেলে এই খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আরও আগ্রহী হবেন। সভায় ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সভাপতি এম এ হাকিম, ফাইবার এট হোমের চেয়ারম্যান মইনুল হক সিদ্দিকী এবং মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (এমটব) মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকারসহ খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা একমত হন যে, সঠিক সময়ে সঠিক বিনিয়োগ এবং দূরদর্শী নীতিমালা না থাকলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুফল ভোগ করা বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।

জাতীয় তথ্য প্রুযুক্তি শীর্ষ সংবাদ