সুবিধাবাদের রাজনীতি পরিহার করে গণভোটের রায় কার্যকর করার আহ্বান মামুনুল হকের

সুবিধাবাদের রাজনীতি পরিহার করে গণভোটের রায় কার্যকর করার আহ্বান মামুনুল হকের

রাজনৈতিক ডেস্ক

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিচারিতা ও সুবিধাবাদী অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে কোনো ধরনের প্রতারণা বরদাশত করা হবে না। তিনি বিএনপিকে লক্ষ্য করে বলেন, সুবিধাবাদের রাজনীতি পরিহার করে গণভোটের রায় এবং জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হতে হবে। অন্যথায় জাতি তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে।

শনিবার (২৫ এপ্রিল) রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত এক বিশাল জনসমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সংবিধান সংস্কার এবং জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী করণীয় বিষয়ে তিনি তাঁর দীর্ঘ বক্তব্যে বিস্তারিত আলোকপাত করেন।

মাওলানা মামুনুল হক বিএনপির অতীত ও বর্তমান রাজনৈতিক কৌশলের ব্যবচ্ছেদ করে বলেন, একটি বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির রাজনীতি এখন দুটি নেতিবাচক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে—সুবিধাবাদ এবং দ্বিচারিতা। তিনি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে বলেন, বিগত নির্বাচনের পূর্বমুহূর্তে তারা গোপনে গণভোটে ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিল। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত এই গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়নে সক্রিয় ছিল। কিন্তু যখন তারা অনুধাবন করল যে জনস্রোত ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ধাবিত হচ্ছে, তখন পরাজয় নিশ্চিত জেনে কৌশল পরিবর্তন করে তারা প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেয়।

তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনে জয়লাভের পর তারা জনগণের কাছে দেওয়া অঙ্গীকার ভুলে গিয়ে মোনাফেকি ও দ্বিচারিতার আশ্রয় নিয়েছে। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “এই ধরনের চাতুর্য দিয়ে একবার বৈতরণি পার হওয়া গেলেও বারবার সম্ভব নয়। বাংলার সচেতন মানুষ এখন সবকিছু বোঝে। আপনারা যদি নিজেদের শুধরে না নেন, তবে ভবিষ্যতে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবেন।”

দেশের সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে মাওলানা মামুনুল হক তাঁর গভীর উদ্বেগের কথা জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১৭ বার সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু কোনোটিই টেকসই বা জনবান্ধব প্রমাণিত হয়নি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষ কেবল তালি মারা বা আংশিক সংশোধন চায় না। জনগণের ম্যান্ডেট ছিল একটি শক্তিশালী ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের মাধ্যমে সংবিধানের আমূল পরিবর্তন ও একটি টেকসই রাষ্ট্র কাঠামো নিশ্চিত করা।

তিনি আরও বলেন, সংসদীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে অতীতে যেমন ব্যক্তিস্বার্থ বা দলীয় স্বার্থে সংবিধান কাটাছেঁড়া করা হয়েছে, তার পুনরাবৃত্তি জাতি আর দেখতে চায় না। জনগণের আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি গাঠনিক ও অংশগ্রহণমূলক সংস্কার প্রক্রিয়া। কিন্তু বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে যেসব ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমতের প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে, তা মূলত নিজেদের সংকীর্ণ এজেন্ডা চাপিয়ে দেওয়ার নামান্তর। একে তিনি জনগণের সঙ্গে ‘নতুন মোড়কে প্রতারণা’ হিসেবে অভিহিত করেন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বা ‘জুলাই সনদ’ প্রসঙ্গে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত এই বিপ্লবের স্পিরিট অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতে হবে। যারা ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্ত এবং আহতদের আর্তনাদ ভুলে যেতে চাচ্ছেন, তাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে লড়াই এখনো শেষ হয়নি। জুলাই বিপ্লবের যোদ্ধারা এবং শহীদ পরিবারগুলো সজাগ রয়েছে। যদি এই স্পিরিটের অবমাননা করা হয় বা কোনো প্রকার ভাওতাবাজির আশ্রয় নেওয়া হয়, তবে দেশজুড়ে আবারও নতুন সংগ্রামের দাবানল জ্বলে উঠবে।

সমাবেশে তিনি দেশের সকল ইসলামি ও সমমনা দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির লড়াই বন্ধ করে দেশের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা এবং সংস্কার প্রক্রিয়ায় মনোনিবেশ করা জরুরি। ভাষণের শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ এখন একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিতামূলক এবং বৈষম্যহীন রাজনৈতিক পরিবেশ চায়, যেখানে কোনো সুবিধাবাদের স্থান থাকবে না।

শনিবারের এই সমাবেশকে কেন্দ্র করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক জনসমাগম ঘটে। মামুনুল হকের বক্তব্য চলাকালীন নেতা-কর্মীরা মুহুর্মুহু স্লোগান দিয়ে তাঁর বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মামুনুল হকের এই কড়া বার্তা দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নতুন করে মেরুকরণ সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার ও ভবিষ্যৎ নির্বাচনের রূপরেখা নির্ধারণের ক্ষেত্রে।

রাজনীতি শীর্ষ সংবাদ