রাজনীতি ডেস্ক
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার নিশ্চিত না করলে দেশ পুনরায় ফ্যাসিবাদের কবলে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির নেতৃবৃন্দ বলছেন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বিচার বিভাগসহ প্রধান সাংবিধানিক পদগুলোতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার আমূল পরিবর্তনই হলো রাষ্ট্র সংস্কারের মূল ভিত্তি। এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের ভিন্নমত বা বাধা জনগণের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী বলে তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশে এসব কথা বলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। অবিলম্বে গণভোটের দাবি বাস্তবায়ন এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
সমাবেশে প্রধান বক্তার বক্তব্যে গোলাম পরওয়ার প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সাম্প্রতিক অবস্থানের সমালোচনা করে বলেন, একটি স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামো বিনির্মাণের জন্য যেসব সংস্কার প্রস্তাব করা হয়েছে, সেখানে ভিন্নমত পোষণ করার অর্থ হলো জনগণের ম্যান্ডেটকে অস্বীকার করা। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের প্রায় ৫ কোটি মানুষ সরাসরি ভোটের মাধ্যমে সংস্কারের পক্ষে তাদের রায় প্রদান করেছেন। এই বিশাল জনমত প্রতিফলিত হওয়ার পর কোনো রাজনৈতিক দলের ‘নোট অফ ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমতের আর কোনো কার্যকারিতা থাকে না। জনগণের এই রায়কে পাশ কাটিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার চেষ্টা করলে তা হবে একটি ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’।
সংবিধান সংস্কারের গুরুত্ব তুলে ধরে জামায়াত নেতা বলেন, গণভোটের ব্যালটে যে সুনির্দিষ্ট প্রশ্নসমূহ উত্থাপন করা হয়েছিল, সেখানে জনরায়ের মাধ্যমে এটি স্পষ্ট যে জাতি আমূল পরিবর্তন চায়। জনগণের এই রায়কে আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তি দিতে হবে। তিনি বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সংসদ সেশন চলাকালীন অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করতে হবে। গণভোটের ফলাফল অনুযায়ী সংস্কার প্রস্তাবগুলোকে সংবিধানের তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। এটি নিশ্চিত করা গেলেই জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের আত্মত্যাগ সার্থক হবে।
বিপ্লব-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান থেকে সব রাজনৈতিক দলকে শিক্ষা নিতে হবে। জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে অবজ্ঞা করে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার দিন শেষ হয়ে গেছে। যদি সংস্কার প্রক্রিয়া ব্যাহত করা হয় বা শহীদদের রক্তস্নাত পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার চেষ্টা করা হয়, তবে সংশ্লিষ্টদের কঠিন পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।
জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, ১১ দলীয় ঐক্যের ব্যানারে সংস্কারের দাবিতে দেশব্যাপী বিক্ষোভ সমাবেশ, মিছিল, সেমিনার ও গোলটেবিল বৈঠকের মতো দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি শুরু হয়েছে। সংসদের ভেতরে এবং রাজপথে—উভয় ক্ষেত্রেই এই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত জুলাই বিপ্লবের প্রকৃত লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় আসছে, ততক্ষণ জামায়াতে ইসলামী রাজপথ ছাড়বে না।
সমাবেশে দলের অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দও বক্তব্য রাখেন। তারা ঐক্যবদ্ধভাবে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজে সব পক্ষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান এবং সতর্ক করেন যে, সংস্কারের প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করলে তা পুনরায় স্বৈরতন্ত্রের পথ সুগম করতে পারে। আজকের এই সমাবেশকে ঘিরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও সংলগ্ন এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। দুপুর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মিছিল নিয়ে জামায়াত ও শিবিরের নেতা-কর্মীরা সমাবেশস্থলে জড়ো হতে থাকেন। এর ফলে বিকেলের দিকে শাহবাগ ও মৎস্য ভবন এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।


