অপরাধ ও সীমান্ত ডেস্ক
কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার বালুখালী সীমান্ত সংলগ্ন মিয়ানমারের অভ্যন্তরে দেশটির দুটি বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার রাতভর চলা এই ভারী অস্ত্রের ঝনঝনানি ও বিস্ফোরণের শব্দে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সীমান্তজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
স্থানীয় সূত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ১১টা থেকে ১২টা ২০ মিনিট পর্যন্ত প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী এই গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। উখিয়ার বালুখালী বিওপির (বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট) দায়িত্বপূর্ণ এলাকার সীমান্ত পিলার-২০ থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে প্রায় দেড় কিলোমিটার অভ্যন্তরে মিয়ানমারের ‘চাকমা কাটা’ নামক স্থানে এই সংঘর্ষ হয়। ধারণা করা হচ্ছে, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন’ (আরএসও) এবং অপর একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘এআরএ’ সদস্যদের মধ্যে এই আধিপত্য বিস্তারের লড়াই সংঘটিত হয়েছে। সংঘর্ষ চলাকালে উভয় পক্ষ অন্তত শতাধিক রাউন্ড গুলি ও শক্তিশালী গ্রেনেড বা মর্টার শেল ব্যবহার করেছে বলে ধারণা করছেন সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিজিবির উখিয়া ব্যাটালিয়নের (৩৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম। তিনি জানান, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে অভ্যন্তরীণ সংঘাতের জেরে এই গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। সীমান্ত দিয়ে কোনো প্রকার অবৈধ অনুপ্রবেশ বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে বিজিবি সর্বোচ্চ সর্তক অবস্থানে রয়েছে এবং টহল জোরদার করা হয়েছে।
মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান এই সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জনপদে। বিশেষ করে উখিয়ার বালুখালী এবং পালংখালী ইউনিয়নের বাসিন্দারা সারা রাত আতঙ্কে নির্ঘুম কাটিয়েছেন। বালুখালী গ্রামের বাসিন্দা আবুল কাশেম জানান, মঙ্গলবার রাতে হঠাৎ করেই সীমান্তের ওপার থেকে বিকট শব্দে গোলাগুলি শুরু হয়। গোলার শব্দে ঘরবাড়ি কেঁপে উঠছিল, যার ফলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সারারাত চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে কাটাতে হয়েছে।
উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী সীমান্ত পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, “মিয়ানমারের ওপার থেকে ভেসে আসা গোলাগুলির শব্দে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনে সীমান্তের কাছাকাছি না যাওয়ার জন্য এবং অত্যন্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছি। প্রায়ই সীমান্তের ওপারে এমন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সামরিক জান্তা বাহিনীর সাথে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর লড়াই গত কয়েক মাস ধরে তীব্রতর হয়েছে। তবে মাঝেমধ্যেই সেখানে সক্রিয় বিভিন্ন রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যেও অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও এলাকা দখলের লড়াই হতে দেখা যাচ্ছে। মঙ্গলবারের ঘটনাটি মূলত দুটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় এর আগে মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলি বা মর্টার শেলের আঘাতে হতাহত হওয়ার নজির থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে ভীতি আরও গভীর হচ্ছে। গত কয়েক দিনে টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্তে বিচ্ছিন্নভাবে এ ধরনের সংঘাতের খবর পাওয়া গেছে। এ ধরনের পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্তে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত। অবৈধভাবে কেউ যাতে সীমান্ত অতিক্রম করতে না পারে, সে লক্ষ্যে ড্রোন ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমেও পর্যবেক্ষণ চালানো হচ্ছে।
বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও সীমান্তের ওপারে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানের কারণে উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয় প্রশাসন সীমান্ত সংলগ্ন কৃষি জমি ও পাহাড়ি এলাকায় চলাচলের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা জারি করেছে। মূলত জান্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ হারানো এলাকাগুলোতে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ক্ষমতার লড়াই নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করছে, যা বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।


