অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক
সাতক্ষীরা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী একটি ট্রাক থেকে কেমিক্যাল ও বিষাক্ত কার্বাইড মিশিয়ে কৃত্রিমভাবে পাকানো প্রায় ৯ হাজার কেজি অপরিপক্ক আম জব্দ করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার গভীর রাতে সাতক্ষীরা সদর থানা সংলগ্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে এই বিশাল চালানটি আটক করা হয়। জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি বিবেচনায় জব্দকৃত এসব আম পরবর্তীতে প্রশাসনের উপস্থিতিতে ধ্বংস করা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরার আম দেশজুড়ে খ্যাতি অর্জন করায় এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী মৌসুমের শুরুতেই বাড়তি মুনাফার আশায় অপরিপক্ক আম বাজারজাত করার চেষ্টা করছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মঙ্গলবার দিবাগত রাত ২টার দিকে সাতক্ষীরা সদর থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল শহরের প্রবেশমুখে অবস্থান নেয়। এ সময় কালিগঞ্জ থেকে চট্টগ্রামগামী একটি পণ্যবাহী ট্রাক তল্লাশি করে ৩৫১ ক্যারেট ভর্তি কাঁচা আম পাওয়া যায়। প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা যায়, আমগুলো দ্রুত পাকানোর উদ্দেশ্যে নিষিদ্ধ কার্বাইড ও অন্যান্য রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, এই বিশাল চালানটি চট্টগ্রামের ফলের আড়তগুলোতে সরবরাহের কথা ছিল। সাতক্ষীরায় সাধারণত মে মাসের মাঝামাঝি থেকে আম পাড়ার আনুষ্ঠানিক সময়সীমা নির্ধারিত থাকে। তবে নির্ধারিত সময়ের অন্তত ১৫-২০ দিন আগেই এসব হিমসাগর ও গোবিন্দভোগ আম পেড়ে কৃত্রিমভাবে পাকানো হচ্ছিল। রাসায়নিক প্রয়োগের ফলে আমগুলোর গায়ের রং আকর্ষণীয় মনে হলেও ভেতরে সেগুলো অপরিপক্ক ছিল।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বুধবার দুপুরে জেলা প্রশাসনের নির্দেশে জব্দকৃত আমগুলো সাতক্ষীরার বিনেরপোতা এলাকায় পৌরসভার আবর্জনার ভাগাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বুলডোজারের সাহায্যে আমগুলো পিষে ফেলে মাটির নিচে চাপা দেওয়া হয়। জনসমক্ষে এই ধ্বংস প্রক্রিয়া পরিচালনার মাধ্যমে অসাধু ব্যবসায়ীদের কঠোর বার্তা প্রদান করা হয়েছে বলে মনে করছে জেলা প্রশাসন।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অর্ণব দত্ত সংবাদমাধ্যমকে জানান, “সাতক্ষীরার আমের যে ঐতিহ্য ও সুনাম রয়েছে, তা ক্ষুণ্ণ করার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ভোক্তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলে অধিক মুনাফার চেষ্টা করছিল। আমরা সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। বাজার মনিটরিং এবং মহাসড়কগুলোতে এ ধরনের কঠোর নজরদারি ও ভেজালবিরোধী অভিযান আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্বাইড বা এ জাতীয় রাসায়নিক দিয়ে পাকানো ফল দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটি কিডনি, লিভার এবং পরিপাকতন্ত্রের মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। প্রতি বছরই সাতক্ষীরায় আম সংগ্রহের একটি ক্যালেন্ডার নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, যাতে কৃষকরা প্রাকৃতিকভাবে পাকা আম বাজারে সরবরাহ করতে পারেন। তবে ক্যালেন্ডার অমান্য করে এবং অসাধু প্রক্রিয়া অবলম্বন করে আম সরবরাহের এই ঘটনায় স্থানীয় কৃষি বিভাগ ও প্রশাসনের উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ট্রাক চালক ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কৃষকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যাতে তারা লোভে পড়ে অসময়ে আম না পাড়েন এবং ভোক্তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় রাখেন। একইসঙ্গে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। মূলত মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে সাতক্ষীরায় পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন জাতের আম পাড়া শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তার আগেই অসাধু চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠায় জেলাজুড়ে তদারকি জোরদার করা হয়েছে।


