নোয়াখালীতে স্কুলছাত্রী অদিতা হত্যা মামলায় গৃহশিক্ষকের মৃত্যুদণ্ড

নোয়াখালীতে স্কুলছাত্রী অদিতা হত্যা মামলায় গৃহশিক্ষকের মৃত্যুদণ্ড

অপরাধ ও বিচার ডেস্ক

নোয়াখালী জেলা শহরের স্কুলছাত্রী তাসমিয়া হোসেন অদিতা (১৪) হত্যা মামলায় সাবেক গৃহশিক্ষক আব্দুর রহিম ওরফে রনিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন আদালত। একইসঙ্গে আদালত আসামিকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। বুধবার (২৯ এপ্রিল, ২০২৬) দুপুর সোয়া ১টার দিকে নোয়াখালীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মোহাম্মদ খোরশেদুল আলম শিকদার জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন।

রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আব্দুর রহিম ওরফে রনি আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি নোয়াখালী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের লক্ষ্মীনারায়ণপুর মহল্লার খলিল মিয়ার ছেলে। রায় ঘোষণার পর কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাকে জেলা কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

আদালত ও মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০২২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর বিকেলে নোয়াখালী পৌরসভার লক্ষ্মীনারায়ণপুর এলাকার নিজ বাসভবন ‘জাহান মঞ্জিল’ থেকে স্কুলছাত্রী তাসমিয়া হোসেন অদিতার হাত-পা ও গলা কাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। অদিতা নোয়াখালী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ওই রাতেই পুলিশ অভিযান চালিয়ে তার প্রাক্তন গৃহশিক্ষক আব্দুর রহিম রনিকে গ্রেপ্তার করে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তারের সময় রনির শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধস্তাধস্তির চিহ্ন ও নখের আঁচড় পাওয়া গিয়েছিল। এছাড়া তার পরিহিত পোশাকে রক্তের দাগ লক্ষ্য করেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রনি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেন এবং তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছোরা ও ভিকটিমের কক্ষ থেকে লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে আসামি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। জবানবন্দিতে তিনি অদিতাকে ধর্ষণের চেষ্টা ও পরবর্তীতে তা চাপা দিতে শ্বাসরোধ ও গলা কেটে হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দেন।

মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ থেকে ব্যাপক তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়। ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. সেলিম শাহী জানান, মামলার দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ায় বাদীপক্ষের মোট ৪১ জন সাক্ষী এবং আসামিপক্ষের ৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। এছাড়া ফরেনসিক রিপোর্ট, ডিএনএ প্রোফাইলিং এবং জব্দকৃত আলামতসমূহ আদালতে উপস্থাপন করা হয়। আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিকতা বিশ্লেষণ করে আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় এই সর্বোচ্চ সাজা প্রদান করেন।

আদালতের এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিহত অদিতার পরিবার ও স্থানীয় এলাকাবাসী। রায়ের পর এক প্রতিক্রিয়ায় অদিতার মা রাজিয়া সুলতানা বলেন, “দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর আমার মেয়ের হত্যাকারীর উপযুক্ত বিচার হয়েছে। আমরা প্রথম থেকেই ন্যায়বিচারের আশা করেছিলাম। এখন আমাদের একমাত্র দাবি, এই রায় যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়।” তিনি আরও বলেন, এ ধরনের কঠোর সাজা সমাজে অপরাধীদের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো মায়ের বুক এভাবে খালি না হয়।

আইনজীবীদের মতে, চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলাটি দ্রুত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি এবং সর্বোচ্চ সাজা প্রদানের মাধ্যমে বিচার বিভাগের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার প্রশ্নে এ ধরনের রায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া শেষে দণ্ডাদেশ কার্যকর করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

শীর্ষ সংবাদ সারাদেশ