স্বাস্থ্য ডেস্ক
প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী থেকে মানবদেহে ছড়িয়ে পড়া জুনোটিক ভাইরাসগুলোর মধ্যে হান্টা ভাইরাস বর্তমানে জনস্বাস্থ্যের জন্য অন্যতম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত ইঁদুর বা এ জাতীয় বন্য প্রাণীর মাধ্যমে সংক্রমিত এই ভাইরাসটি একক কোনো রোগ নয়, বরং একগুচ্ছ ভাইরাসের সমষ্টি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, ভৌগোলিক অবস্থান ও লক্ষণের ভিন্নতা অনুযায়ী এটি বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। অত্যন্ত উচ্চ মৃত্যুহারের কারণে এই ভাইরাসটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিশেষ সতর্কতা কাজ করছে।
পটভূমি ও বিবর্তন হান্টা ভাইরাসের নামকরণের ইতিহাসটি দক্ষিণ কোরিয়ার হান্টান নদীর সঙ্গে সম্পৃক্ত। ১৯৫০-এর দশকে কোরিয়ান যুদ্ধের সময় কয়েক হাজার সেনাসদস্য অজ্ঞাত এক জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম এই ভাইরাসের অস্তিত্ব নিবিড়ভাবে নজরে আসে। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই ভাইরাসের একটি নতুন এবং অধিকতর শক্তিশালী রূপ শনাক্ত করা হয়, যা ‘হান্টা ভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম’ (এইচপিএস) নামে পরিচিত। এই নতুন সংস্করণটি মানবদেহের ফুসফুসকে সরাসরি আক্রমণ করে দ্রুত অকেজো করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
সংক্রমণ প্রক্রিয়া হান্টা ভাইরাস ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম হলো ইঁদুর বা বুনো ইঁদুরের লালা, মূত্র ও মল। এটি সাধারণত প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ উভয়ভাবেই সংক্রমিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যখন আক্রান্ত ইঁদুরের বর্জ্য শুকিয়ে ধুলার সাথে মিশে বাতাসে ভেসে বেড়ায়, তখন নিশ্বাসের মাধ্যমে সেই দূষিত বাতাস ফুসফুসে প্রবেশ করলে মানুষ আক্রান্ত হয়। একে ‘অ্যারোসল ট্রান্সমিশন’ বলা হয়। এছাড়া আক্রান্ত ইঁদুরের কামড় কিংবা ভাইরাস দ্বারা দূষিত খাবার গ্রহণের মাধ্যমেও সংক্রমণ ঘটা সম্ভব। যদিও হান্টা ভাইরাস সাধারণত মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না, তবে দক্ষিণ আমেরিকায় শনাক্ত হওয়া ‘অ্যান্ডিস ভাইরাস’ নামক একটি বিশেষ ধরনের ক্ষেত্রে বিরলভাবে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
লক্ষণ ও শারীরিক জটিলতা হান্টা ভাইরাসের সংক্রমণ মূলত দুটি প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করে। প্রথমটি হলো পালমোনারি সিনড্রোম (এইচপিএস), যেখানে রোগীর শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং ফুসফুসে তরল জমে যায়। দ্বিতীয়টি হলো হেমোরেজিক ফিভার বা এইচএফআরএস, যার প্রভাবে রোগীর কিডনি বিকল হওয়া এবং অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ দেখা দিতে পারে।
সংক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে একে সাধারণ ফ্লু বা মৌসুমী জ্বর মনে হতে পারে। জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা এবং প্রচণ্ড ক্লান্তির মতো লক্ষণগুলো প্রকাশের কয়েক দিন পরই তীব্র শ্বাসকষ্ট ও কাশি শুরু হয়। অনেক ক্ষেত্রে রোগীর রক্তচাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, হান্টা ভাইরাসে আক্রান্তদের মৃত্যুর হার ৩৮ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে, যা একে বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রাণঘাতী ভাইরাসে পরিণত করেছে।
শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা পদ্ধতি নির্দিষ্ট রক্ত পরীক্ষার (এলাইজা বা পিসিআর) মাধ্যমে হান্টা ভাইরাস শনাক্ত করা হয়। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিষেধক বা সরাসরি কার্যকর অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। ফলে চিকিৎসাব্যবস্থা মূলত লক্ষণভিত্তিক এবং সহায়ক। আক্রান্ত রোগীকে দ্রুত হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করে কৃত্রিম অক্সিজেন সহায়তা প্রদান করা হয়। প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত করা সম্ভব হলে রোগীর বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
প্রতিরোধে করণীয় যেহেতু কোনো কার্যকর ওষুধ নেই, তাই প্রতিরোধই এই ভাইরাস থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বাড়িঘর ও কর্মক্ষেত্র সম্পূর্ণ ইঁদুরমুক্ত রাখার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। ইঁদুরের উপদ্রব আছে এমন বদ্ধ বা অন্ধকার ঘর পরিষ্কার করার সময় সরাসরি ঝাড়ু না দিয়ে মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করে ব্লিচিং পাউডার মিশ্রিত পানি ব্যবহার করা উচিত, যাতে ভাইরাসযুক্ত ধুলা বাতাসে না ওড়ে। খাদ্যদ্রব্য সব সময় নিরাপদ পাত্রে ঢেকে রাখা এবং শস্যদানা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। ইঁদুর মারার চেয়ে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার মাধ্যমেই এই ভাইরাসের বিস্তার রোধ করা সম্ভব।


