মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা হ্রাসে ভারতের মধ্যস্থতা চায় ইরান: দিল্লির কূটনৈতিক টেবিলে জ্বালানি নিরাপত্তা ও ব্রিকস প্রসঙ্গ

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা হ্রাসে ভারতের মধ্যস্থতা চায় ইরান: দিল্লির কূটনৈতিক টেবিলে জ্বালানি নিরাপত্তা ও ব্রিকস প্রসঙ্গ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর দুই মাস পর প্রথম উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সফরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি পৌঁছেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তিন দিনের এই রাষ্ট্রীয় সফরে তিনি ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। এই সফরটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি যে বিমানে করে দিল্লিতে অবতরণ করেছেন, তার নাম ‘মিনাব ১৬৮’। এটি যুদ্ধের শুরুতে ইরানের মিনাব শহরের একটি স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত ১৬৮ জন ছাত্রীর স্মরণে রাখা হয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে একটি শক্তিশালী প্রতীকী বার্তা হিসেবে দেখছেন, যার মাধ্যমে ইরান চলমান যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়টি বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে চাইছে। নয়াদিল্লিতে পৌঁছানোর পর ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল তাকে স্বাগত জানান।

বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই জলপথটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে সম্পন্ন হয়। বর্তমানে এই এলাকায় ইরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভারত তার নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং পণ্যবাহী জাহাজের নিরাপদ চলাচলের বিষয়ে ইরানের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি চাইতে পারে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে ব্রিকস প্রতিনিধিদের সম্ভাব্য আলোচনায় যুদ্ধের প্রভাব ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।

ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবিয়াবাদি জানিয়েছেন, ব্রিকসের মতো জোটে ইরানের সক্রিয় অংশগ্রহণ মূলত এক মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা ও পশ্চিমা অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। ইরান মনে করে, ওয়াশিংটনের একতরফা নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় ব্রিকস একটি বিকল্প অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে জোটের অভ্যন্তরে সব বিষয়ে ঐকমত্য নেই। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক দ্বিমত গত মাসে কোনো যৌথ বিবৃতিতে পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি করেছে।

ভারত বর্তমানে ব্রিকস জোটের সভাপতিত্ব করছে। ইরানের প্রত্যাশা, ঐতিহাসিকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখা নয়াদিল্লি এই অঞ্চলে উত্তেজনা প্রশমনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে ইরান ও আরব দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যমান দূরত্ব কমিয়ে আনতে ভারতের মধ্যস্থতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিতব্য মূল ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এই বৈঠকটি দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ নির্ধারণে নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই সফরের মধ্য দিয়ে ভারত ও ইরানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন মাত্রা এবং জ্বালানি করিডোর হিসেবে পরিচিত চাবাহার বন্দরের প্রাসঙ্গিকতাও পুনরায় আলোচনায় আসতে পারে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ