অপরাধ ডেস্ক
নেত্রকোনা জেলা শহরের উত্তর কাটলি এলাকায় একটি বহুতল ভবনের ভেতর ঢুকে এক গৃহবধূকে গলা কেটে হত্যা করেছে এক যুবক। এ সময় দুর্বৃত্তকে বাধা দিতে গিয়ে নিহত নারীর স্বামী ও ছেলে গুরুতর জখম হয়েছেন। ধার নেওয়া টাকার বিরোধ এবং মাদকাসক্তির জেরে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।
গত সোমবার রাত নয়টার দিকে নেত্রকোনা পৌরসভার উত্তর কাটলি এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। নিহত নারীর নাম মনোয়ারা বেগম (৫০)। তিনি ওই এলাকার বাসিন্দা ও স্থানীয় ঠিকাদার মো. আবু চানের স্ত্রী। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আবদুর রশিদ (৩২) নামের এক যুবককে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছে স্থানীয় জনতা। আটক আবদুর রশিদ একই এলাকার এরশাদ মিয়ার ছেলে এবং পেশায় একজন ইজিবাইকচালক।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইজিবাইকচালক আবদুর রশিদ মাঝেমধ্যেই ঠিকাদার আবু চানের স্ত্রী মনোয়ারা বেগমের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে টাকা ধার নিতেন। ঘটনার দিন সোমবার রাত আনুমানিক সাড়ে আটটার দিকে রশিদ মনোয়ারার বাসায় যান এবং জরুরি প্রয়োজনে পাঁচ হাজার টাকা ধার দাবি করেন। ঘটনার সময় মনোয়ারা বেগমের স্বামী ও সন্তানরা ঘরের বাইরে ছিলেন। মনোয়ারা বেগম টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে আবদুর রশিদ ক্ষিপ্ত হয়ে ঘরে থাকা ধারালো বঁটি দিয়ে মনোয়ারা বেগমকে আঘাত করেন এবং গলা কেটে তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন। হত্যাকাণ্ড আড়াল করার উদ্দেশ্যে তিনি নিহতের মরদেহ ঘরের একটি খাটের নিচে লুকিয়ে রাখেন।
এদিকে ঘটনার পরপরই মনোয়ারা বেগমের ছোট ছেলে আবির হাসান (২৫) ঘরে প্রবেশ করেন এবং খাটের নিচে মায়ের মরদেহ ও ঘরের মেঝেতে রক্ত দেখে ফেলেন। উপস্থিতি টের পেয়ে অভিযুক্ত রশিদ আবির হাসানের ওপর আচমকা হামলা চালান এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করেন। আবিরের চিৎকার শুনে তার বাবা আবু চান ছেলেকে উদ্ধার করতে এগিয়ে এলে আবদুর রশিদ তাকেও কুপিয়ে রক্তাক্ত করেন।
ঘর থেকে জখম হওয়া ব্যক্তিদের চিৎকার ও ধস্তাধস্তির শব্দ শুনে প্রতিবেশীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তারা রক্তাক্ত অবস্থায় পিতা-পুত্রকে উদ্ধার করার পাশাপাশি অভিযুক্ত আবদুর রশিদকে ঘরের ভেতরই অবরুদ্ধ করে আটক করেন। পরে স্থানীয়রা নেত্রকোনা মডেল থানা পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযুক্তকে নিজেদের হেফাজতে নেয়।
গুরুতর আহত আবু চান ও তার ছেলে আবির হাসানকে উদ্ধার করে তাৎক্ষণিকভাবে নেত্রকোনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। তবে ছেলে আবির হাসানের শরীরের বিভিন্ন স্থানে গভীর ক্ষত থাকায় এবং অবস্থার অবনতি হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে জরুরি ভিত্তিতে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
খবরের তথ্য অনুযায়ী, নেত্রকোনা জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পুলিশ নিহতের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে।
নেত্রকোনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সজল কুমার সরকার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও অনুসন্ধানে জানা গেছে আটক আবদুর রশিদ মাদকাসক্ত ছিলেন। মাদকের অর্থ জোগাড় করার জন্যই তিনি নিহত মনোয়ারা বেগমের কাছে পাঁচ হাজার টাকা ধার চেয়েছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। টাকা না পেয়ে তিনি এই হত্যাকাণ্ড ঘটান এবং তাকে প্রতিহত করতে গেলে নিহতের স্বামী ও সন্তানকে জখম করেন। তবে এই ঘটনার নেপথ্যে অন্য কোনো পারিবারিক বা আর্থিক বিরোধ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছে। এই ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।


