অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনা নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের কারণে তেলের দাম গত দিনের বড় উত্থানের পর আজ কিছুটা কমেছে। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মজুত হ্রাসের মতো বহুমাত্রিক বিষয় এখন বৈশ্বিক তেল বাজারকে প্রভাবিত করছে।
২ জুন আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রিনউইচ সময় সকাল ৪টা ৩৪ মিনিটে অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭৫ সেন্ট বা ০.৭৯ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৪.২৩ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ৮৫ সেন্ট বা ০.৯২ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯১.৩১ ডলারে দাঁড়ায়। এর আগের কার্যদিবসে উভয় ধরনের তেলের দামই ৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল। অথচ সদ্য সমাপ্ত মে মাসজুড়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির আশায় তেলের দাম প্রায় ১৬ শতাংশ কমেছিল। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো অগ্রগতি বা বাজারকে স্বস্তি দেওয়ার মতো বাস্তব পরিবর্তন না আসায় এই অস্থিরতা বজায় রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার কূটনৈতিক আলোচনার গতিপ্রকৃতি তেলের বাজার স্থিতিশীল হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে আলোচনা অব্যাহত রাখার কথা বলা হলেও হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি। বাজার সংশ্লিষ্টরা এখন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন যে, দুই পক্ষের আলোচনার অবস্থান কোন দিকে মোড় নেয়। কারণ এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার ওপরই নির্ভর করছে তেলের বাজারে যুক্ত হওয়া ঝুঁকিজনিত অতিরিক্ত মূল্য বা ‘রিস্ক প্রিমিয়াম’ বজায় থাকবে নাকি কমবে। এর মধ্যে লেবাননে আংশিক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এবং হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত কিছুটা কমে আসাকে ইরানকে ঘিরে সৃষ্ট আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভূ-রাজনৈতিক এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ চেইনে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর থেকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অ-ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কার্যত বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ ব্যাহত হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম পূর্বের তুলনায় ৫০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়। বৈশ্বিক শিপিং খাতের কর্মকর্তাদের মতে, যেকোনো ভবিষ্যৎ শান্তিচুক্তিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ ও স্বাভাবিক চলাচলের বিষয়টি স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করা জরুরি।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটের কারণে বিকল্প উৎস হিসেবে এশিয়া ও ইউরোপের শোধনাগারগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদিত জ্বালানি তেলের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলশ্রুতিতে মে মাসে দেশটির অপরিশোধিত তেল রপ্তানি দৈনিক ৫৬ লাখ ব্যারেলের রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। পাশাপাশি মে মাসের শেষ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অপরিশোধিত তেলের মজুত প্রায় ৩৬ লাখ ব্যারেল কমেছে, যার প্রভাব আগামী দিনগুলোতে পেট্রোল ও ডিজেলের বাজারেও পড়তে পারে। সরবরাহ সংকটের এই অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সমীকরণই বর্তমানে বিশ্ব বাজারে তেলের মূল্য নির্ধারণে মূল ভূমিকা রাখছে।


