জাতীয় ডেস্ক
পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন ও ঈদপরবর্তী যাতায়াতে দেশে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা এবং প্রাণহানি উভয়ই আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ঈদুল আজহার আগে ও পরে মোট ১৫ দিনে সারা দেশে ৩৯৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০২ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৯৪ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে সড়ক, রেল ও নৌপথ মিলিয়ে মোট ৪৪২টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৩৮ জন এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ৩৪০ জন।
আজ রবিবার সকালে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনী মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে যাত্রী অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি বেসরকারি সংগঠন এই তথ্য প্রকাশ করে। সংগঠনের বার্ষিক ঈদ দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন থেকে এই চিত্র সামনে এসেছে।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, গত বছরের ঈদুল আজহার তুলনায় এবার সড়ক দুর্ঘটনা ৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ, প্রাণহানি ৩ দশমিক ০৭ শতাংশ এবং আহতের হার ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সড়ক পথের পাশাপাশি রেল ও নৌপথেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দুর্ঘটনা ঘটেছে। গত ১৫ দিনে রেলপথে ৩১টি দুর্ঘটনায় ২৩ জন এবং নৌপথে ১৭টি দুর্ঘটনায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল। উৎসবের এই সময়ে মোট ১৫৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫৯ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৩৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং মোট নিহতের ৩৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
সংবাদ সম্মেলনে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য বেশ কিছু প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে চালকদের বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক, ত্রুটিপূর্ণ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন মহাসড়কে চলাচল এবং দীর্ঘ সময় একটানা গাড়ি চালানোর ফলে চালকদের ক্লান্তি ও বিশ্রামহীনতাকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভাঙাচোরা সড়ক ও মহাসড়কের বেহাল দশা, ঈদে অতিরিক্ত যাত্রীচাপ সামলাতে গিয়ে যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতাও এই বিপুল প্রাণহানির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি বছর ঈদের সময় সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বৃদ্ধির এই ধারা দেশের সার্বিক সড়ক যোগাযোগ ও ব্যবস্থাপনা কাঠামোর দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। ঈদকেন্দ্রিক স্বল্পমেয়াদি বা সাময়িক কিছু উদ্যোগ নিয়ে এই মহাসড়কীয় বিশৃঙ্খলা ও জানমালের ক্ষতি রোধ করা সম্ভব নয়। প্রতি বছরই ঈদের আগে-পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ও নজরদারির কথা বলা হলেও, বাস্তবে তার সুফল মিলছে না।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনার ওপর জোর দেওয়া জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে— আধুনিক ও সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করা, প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করা, চালকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও লাইসেন্সবিহীন চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা। একই সাথে দূরপাল্লার রুটে চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা করা এবং মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক ও ত্রুটিসমূহ দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন। সড়ক নিরাপদ করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পাশাপাশি পরিবহন মালিক, শ্রমিক এবং সাধারণ যাত্রী ও পথচারীদের সচেতনতা ও আইন মানার মানসিকতা তৈরি করা অপরিহার্য।


