কঙ্গোয় ইবোলা নিয়ন্ত্রণে ৫১৮ মিলিয়ন ডলারের আঞ্চলিক পরিকল্পনা ঘোষণা

কঙ্গোয় ইবোলা নিয়ন্ত্রণে ৫১৮ মিলিয়ন ডলারের আঞ্চলিক পরিকল্পনা ঘোষণা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআরসি) নতুন করে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে ৫১৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি ব্যাপকভিত্তিক কৌশলগত পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং আফ্রিকা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (আফ্রিকা সিডিসি)। ২০২৬ সালের জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আগামী ছয় মাসের জন্য প্রণীত এই ‘মহাদেশীয় প্রস্তুতি ও সাড়াদান পরিকল্পনা’ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে।

ডব্লিউএইচও-এর মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেউসাস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই যৌথ পরিকল্পনার বিশদ বিবরণ প্রকাশ করেছেন। আন্তর্জাতিক এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য হলো ইবোলার বিস্তার রোধ করা এবং আক্রান্ত অঞ্চলের স্বাস্থ্য অবকাঠামোকে শক্তিশালী করা। এই বিশাল কর্মসূচি সফল করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে অংশীদার হিসেবে যুক্ত হয়েছে জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ), শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি), আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (আইএফআরসি) এবং রোগ নির্ণয় সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সংস্থা ফাইন্ডডিএক্স।

এই জরুরি সংকট মোকাবিলায় ডব্লিউএইচও প্রধান কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট ফেলিক্স শিসেকেদির সঙ্গে সম্প্রতি একটি উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক সম্পন্ন করেছেন। বৈঠকে কঙ্গোর বুন্দিবুজিও ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট ইবোলা পরিস্থিতির সার্বিক চিত্র এবং তা নিয়ন্ত্রণে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। মহাপরিচালক গেব্রেউসাস দেশটির সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বুনিয়া প্রদেশ সফরের অভিজ্ঞতা প্রেসিডেন্টকে অবহিত করেন। একই সঙ্গে ডব্লিউএইচও কর্তৃক নির্মিত এবং স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কাছে সদ্য হস্তান্তরিত একটি বিশেষায়িত ইবোলা চিকিৎসা কেন্দ্রের কার্যক্রমসহ রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পরিধি বাড়ানোর অগ্রগতি নিয়ে দুই নেতার মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়।

ইবোলা প্রাদুর্ভাবের কার্যকর বিস্তার রোধে স্থানীয় জনগণকে সচেতন ও সংগঠিত করার বিষয়ে উভয় পক্ষই সম্পূর্ণ একমত পোষণ করেছে। ডব্লিউএইচও প্রধানের মতে, এই স্বাস্থ্য বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সামাজিক নেটওয়ার্কগুলোকে সক্রিয় করা অত্যন্ত জরুরি। এর পাশাপাশি আক্রান্তদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ দাফন নিশ্চিত করা, সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা এবং রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়ামাত্র মানুষকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। চিকিৎসকদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব এবং ইতিমধ্যেই কঙ্গোয় অনেক রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন, যা এই ধারণাকে প্রমাণ করে।

তবে বর্তমান এই মহামারি পরিস্থিতিতে ডব্লিউএইচও কঙ্গোর অন্যান্য জরুরি স্বাস্থ্য ও মানবিক সেবাগুলোকে অবহেলা না করার জন্য সতর্ক করেছে। দেশটির সম্মুখসারির স্বাস্থ্যকর্মীদের নিষ্ঠার প্রশংসা করে তাদের জন্য পর্যাপ্ত ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

এই বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকট মুহূর্তে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কঙ্গোর পাশে দাঁড়িয়ে সুসমন্বিত সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ করার আহ্বান জানিয়েছে ডব্লিউএইচও। তবে একই সঙ্গে সংস্থাটি কঙ্গোর ওপর এমন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ভ্রমণ বা বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করার অনুরোধ জানিয়েছে, যা দেশটির অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে কিংবা চলমান মহামারি বিরোধী লড়াইকে বাধাগ্রস্ত করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিশ্চিত করেছে যে, এই প্রাদুর্ভাব সম্পূর্ণ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত তারা কঙ্গোর পাশে থাকবে এবং এই জরুরি অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য খাতকে আরো শক্তিশালী করতে কাজ করবে।

উল্লেখ্য, ইবোলা মূলত একটি মারাত্মক ভাইরাল হেমোরেজিক ফিভার বা রক্তক্ষরণকারী জ্বর, যা ‘বুন্দিবুজিও’ নামক ভাইরাস স্ট্রেনের সংক্রমণের কারণে ঘটে থাকে। এটি একটি অত্যন্ত সংক্রামক এবং উচ্চ মৃত্যুঝুঁকিসম্পন্ন রোগ। বর্তমানে বুন্দিবুজিও স্ট্রেনজনিত ইবোলা প্রতিরোধ বা সুনির্দিষ্ট চিকিৎসার জন্য বিশ্বস্তরে অনুমোদিত কোনো ভ্যাকসিন কিংবা নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ না থাকায় বিশ্বজুড়ে এই প্রাদুর্ভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ