আন্তর্জাতিক ডেস্ক
তাইওয়ানের চতুর্দিকে আবারও চীনের সামরিক ও সরকারি বাহিনীর বড় ধরনের তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। সোমবার (৮ জুন) সকাল ৬টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় তাইওয়ানের আকাশসীমা ও জলসীমায় চীনের ২টি যুদ্ধবিমান, ৬টি নৌযান এবং ৭টি সরকারি জাহাজ শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দ্বীপরাষ্ট্রটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। সাম্প্রতিক সময়ে তাইওয়ান প্রণালি ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বেইজিংয়ের সামরিক চাপ বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় এই নতুন তৎপরতা দেখা দিল।
তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে জানানো হয় যে, শনাক্ত হওয়া ২টি চীনা যুদ্ধবিমানই তাইওয়ানের পূর্বাঞ্চলীয় বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ অঞ্চলে (এডিআইজেড) প্রবেশ করেছিল। চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) এই তৎপরতাকে উস্কানিমূলক হিসেবে দেখছে তাইপে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাইওয়ানের সশস্ত্র বাহিনী আকাশ ও জলসীমার নিরাপত্তা বজায় রাখতে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করেছে এবং সামরিক প্রোটোকল অনুযায়ী বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করাসহ প্রয়োজনীয় পাল্টা সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণও এই সামরিক তৎপরতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে কাজ করছে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাইওয়ান পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতার আভাস পাওয়া গেছে। মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, তারা তাইওয়ান প্রণালির শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। চীনা নেতৃত্বের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর মার্কিন নীতি-নির্ধারকদের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, তাইওয়ান ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মহলের সব পক্ষের সাথে আলোচনা চলমান রয়েছে এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানকে বেইজিং তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বৈশ্বিক হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য করে থাকে, যা ওই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার অন্যতম কারণ।
ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিকভাবে তাইওয়ানের ওপর চীনের মালিকানার দাবিটি অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘদিনের। বেইজিংয়ের মূল ভূখণ্ডের শাসকগোষ্ঠী মনে করে, তাইওয়ান চীনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে হলেও এটিকে মূল ভূখণ্ডের সাথে পুনরেকত্রীকরণ করা হবে। এই দাবির সপক্ষে চীন ১৬৮৩ সালে চিং রাজবংশ কর্তৃক এই দ্বীপটি দখলের ঐতিহাসিক নজির উপস্থাপন করে থাকে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে বেইজিং ‘এক চীন নীতি’ কঠোরভাবে বজায় রাখার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছে।
অন্যদিকে, তাইওয়ান ১৯৪৯ সাল থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজস্ব গণতান্ত্রিক সরকার, শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ও স্বনির্ভর অর্থনীতি পরিচালনা করে আসছে। দ্বীপটি নিজেকে একটি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করে, যদিও বৈশ্বিক কূটনৈতিক জটিলতার কারণে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের সাথে এর আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রদূতিয় সম্পর্ক নেই। আন্তর্জাতিক আইনে তাইওয়ানের এই সার্বভৌমত্ব, স্বায়ত্তশাসন এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যে বিতর্ক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, তাইওয়ানের চারপাশে নিয়মিত বিরতিতে চীনের এই সামরিক উপস্থিতি ও মহড়া কেবল শক্তি প্রদর্শন নয়, বরং তাইপেইয়ের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার গভীরতা পরিমাপ করার একটি কৌশলগত প্রয়াস। এই অঞ্চলের সামরিক ভারসাম্য এবং সরবরাহ চেইনের গুরুত্ব বিবেচনা করে তাইওয়ান প্রণালির যেকোনো বড় ধরনের অস্থিরতা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


