আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সাম্প্রতিক তীব্র সামরিক উত্তেজনার পর সাময়িক যুদ্ধবিরতি চলাকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ‘পূর্ণাঙ্গ বিজয়’ ঘোষণা করতে সক্ষম হবে। গত সোমবার সাউথ ক্যারোলাইনার সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের সমর্থনে আয়োজিত এক নির্বাচনী টেলি-র্যালিতে অংশ নিয়ে ট্রাম্প এই মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, এই সম্ভাব্য রাজনৈতিক ও সামরিক নিষ্পত্তির ফলে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত হ্রাস পাবে।
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন এক সময়ে এই দাবি করা হলো, যখন ইরান ও ইসরায়েল দীর্ঘ সংঘাতের পর পুনরায় বড় ধরনের পাল্টাপাল্টি আক্রমণ থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সাময়িক এই যুদ্ধবিরতির মধ্যেও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তেহরান স্পষ্ট জানিয়েছে যে, তারা নতুন করে কোনো সামরিক আগ্রাসন দেখতে চায় না, তবে ইসরায়েল বা তার মিত্ররা যদি পুনরায় আক্রমণ চালায় তবে তার ‘বিধ্বংসী’ জবাব দেওয়া হবে। অন্যদিকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষও আত্মরক্ষার অধিকার বজায় রেখে যেকোনো পরিস্থিতিতে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানানোর অনড় অবস্থানে রয়েছে।
সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প বলেন, মার্কিন প্রশাসন ও তার কূটনৈতিক দল অত্যন্ত কঠোরভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছে। চলমান ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে যখন চূড়ান্ত বিজয় ঘোষণা করা হবে, তখনই এই সংকটের প্রকৃত এবং স্থায়ী সমাধান আসবে। ট্রাম্পের মতে, তেহরান বর্তমানে ওয়াশিংটনের সাথে একটি স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছাতে অত্যন্ত আগ্রহী এবং তারা পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিতকরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে শর্ত মেনে নিতে প্রস্তুত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে দুই সপ্তাহের এই নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে এপ্রিল মাসের শুরুতে যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তখনও চুক্তিটি চূড়ান্ত করার জন্য দুই সপ্তাহের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কূটনৈতিকভাবে এই প্রক্রিয়াটি দীর্ঘায়িত হওয়ার বিষয়ে মার্কিন গণমাধ্যমে প্রশ্ন তোলা হলে ট্রাম্প জানান, ইরানের দীর্ঘদিনের জাতীয় নীতি ও রাজনৈতিক কাঠামোর কারণে তাদের পক্ষে হুট করে সব শর্ত মেনে নেওয়া কঠিন এবং এই ধরণের বড় চুক্তির রূপরেখা চূড়ান্ত করতে কিছুটা সময় প্রয়োজন হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সাম্প্রতিক উত্তেজনার সূত্রপাত হয়েছিল লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ধারাবাহিক বিমান হামলাকে কেন্দ্র করে। চলমান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইসরায়েলের এই পদক্ষেপের জবাবে ইরান উত্তর ইসরায়েল লক্ষ্য করে একাধিক দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এর পর পরই ইসরায়েলও ইরানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রকে লক্ষ্য করে বড় ধরনের পাল্টা বিমান হামলা চালায়। এই পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে অঞ্চলটিতে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিলে ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি পোস্টের মাধ্যমে উভয় পক্ষকে অবিলম্বে গোলাগুলি বন্ধ করার আহ্বান জানান।
একই দিন সন্ধ্যায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে নিশ্চিত করেন যে, ইরানের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাত এই মুহূর্তের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। তবে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ইরান বা তার আঞ্চলিক প্রক্সি সংগঠনগুলো যদি পুনরায় ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বে আঘাত হানে, তবে তার চেয়েও কঠোর সামরিক জবাব দেওয়া হবে। মার্কিন প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রাখছে, যার ফলশ্রুতিতেই ট্রাম্প খুব দ্রুতই ইরানের ওপর একটি বড় রাজনৈতিক বিজয়ের আশা করছেন।


