হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর ঘোষণা, ফি নির্ধারণে ইরান ও ওমানের যৌথ উদ্যোগ

হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর ঘোষণা, ফি নির্ধারণে ইরান ও ওমানের যৌথ উদ্যোগ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। রাশিয়ায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত কাজেম জালালি জানিয়েছেন, এই প্রণালিটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ট্রানজিট ফিসহ বিভিন্ন শর্ত ইরান ও ওমান যৌথভাবে নির্ধারণ করবে। তিনি উল্লেখ করেন, এই ফি মূলত জাহাজ চলাচলের বিপরীতে প্রদত্ত বিভিন্ন সেবার মূল্য হিসেবে আদায় করা হবে। আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় জাহাজ চলাচলের সার্বিক নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে এই জলপথের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার সামরিক সংঘাতের জেরে এই রুটে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়। এর ফলে বিশ্ববাজারে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেলের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক এই নৌপথে নতুন করে টোল বা ট্রানজিট ফি আরোপের বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের রাষ্ট্রসমূহ তীব্র আপত্তি জানিয়েছে।

অপরদিকে, ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিরসন এবং জলপথের নিরাপত্তা বজায় রাখার লক্ষ্যে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চলমান রয়েছে। তবে এই আলোচনা প্রক্রিয়ায় ইউরোপীয় দেশগুলোর কোনো অংশীদারিত্ব বা ভূমিকা নেই। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান খোঁজা হচ্ছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।

এদিকে যৌথ ব্যবস্থাপনার অংশীদার হলেও ট্রানজিট ফি আদায়ের বিষয়ে ওমানের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ওমানের রাষ্ট্রদূত তালাল বিন সুলাইমান আল-রাহবি ওয়াশিংটন প্রশাসনকে আশ্বস্ত করেছেন যে, ওমান হরমুজ প্রণালিতে নতুন কোনো টোল ব্যবস্থা চালুর পক্ষে নয়। মাস্কাট সর্বদা আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের স্বাধীনতার নীতিকে সমর্থন করে। ওমান সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইরানের সঙ্গে তারা কেবল এমন একটি ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা কাঠামো নিয়ে আলোচনা করছে, যা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। একই সাথে, এই বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও)-এর সাথে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও আইনি যাচাই-বাছাই করা হবে।

ঐতিহাসিকভাবে ওমান ও ইরান যৌথভাবে হরমুজ প্রণালির তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছে। তবে দীর্ঘদিনের মার্কিন মিত্র হিসেবে ওমান এই অঞ্চলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পক্ষের মধ্যে একটি নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ওমান একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের সমালোচনা করেছে, অন্যদিকে বাহরাইন ও কুয়েতে ইরানের সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপের বিষয়েও নিন্দা প্রকাশ করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক হলেও, ট্রানজিট ফি আরোপ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি নিয়ে বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ওমান ও ইরানের মধ্যকার নীতিগত অমিল দূর করা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আপত্তি সামাল দিয়ে এই নৌপথকে সচল রাখাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ