মস্কোয় দ্বিপক্ষীয় বৈঠক: বাংলাদেশ-রাশিয়া সম্পর্ক জোরদার ও বাণিজ্য প্রসারে একমত দুই দেশ

মস্কোয় দ্বিপক্ষীয় বৈঠক: বাংলাদেশ-রাশিয়া সম্পর্ক জোরদার ও বাণিজ্য প্রসারে একমত দুই দেশ

বিশেষ প্রতিবেদক

বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ ও সম্প্রসারণের অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে মস্কোতে অনুষ্ঠিত হয়েছে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের ঐতিহাসিক বৈঠক। স্থানীয় সময় সোমবার (৮ জুন) রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সঙ্গে এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন সফররত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি শিল্প, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও বহুপাক্ষিক ফোরামে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ আমন্ত্রণে বর্তমানে মস্কো সফর করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। গুরুত্বপূর্ণ এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং রাশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. নজরুল ইসলাম।

বৈঠকের শুরুতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ঐতিহাসিক ও অবিস্মরণীয় অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম সারির দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। ঐতিহাসিক এই সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীই আগামী ২০২৭ সালে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫৫ বছর পূর্তি যৌথভাবে উদযাপনের বিষয়ে পারস্পরিক প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

বৈঠকে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বাংলাদেশের সঙ্গে মস্কোর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণ ও শক্তিশালী করার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সাথে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে উষ্ণ অভিনন্দন জানান। ড. খলিলুর রহমানও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থিতার প্রতি শুরু থেকেই রাশিয়ার জোরালো সমর্থনের জন্য দেশটির সরকারের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নানাদিক পর্যালোচনাকালে উভয় নেতা শিল্প, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, কৃষি, গবেষণা ও প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, পর্যটন, পরিবহন এবং প্রতিরক্ষা খাতে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো মূল্যায়ন করেন। এসব খাতে সহযোগিতা আরও বেগবান ও ফলপ্রসূ করার বিষয়ে উভয় পক্ষই একমত পোষণ করেছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রত্যাশিত মাত্রায় বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি রাশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত (ডিএফকিউএফ) প্রবেশাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সাথে রুশ বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ করেন তিনি। বাংলাদেশে বিনিয়োগের চমৎকার পরিবেশের কথা উল্লেখ করে ড. খলিলুর রহমান দেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) ও হাইটেক পার্কগুলোতে রাশিয়ার সরকারি ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আহ্বান করেন। তিনি বলেন, হালকা ও ভারী প্রকৌশল শিল্প, খাদ্য ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পেট্রোকেমিক্যাল, ইস্পাত উৎপাদন এবং তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন উদীয়মান খাতে রাশিয়ার বিনিয়োগের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

বাণিজ্যিক পরিধি আরও বিস্তৃত করতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ ও ইউরেশিয়ান ইকোনমিক কমিশনের (ইইসি) মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনে রাশিয়ার সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করেন। বর্তমানে রাশিয়া, বেলারুশ, আর্মেনিয়া, কাজাখস্তান ও কিরগিজস্তান—এই পাঁচটি দেশ নিয়ে ইইসি গঠিত। একই সাথে ব্রিকস (BRICS) ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জোটগুলোর সদস্যপদ অর্জনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের প্রতি রাশিয়ার নীতিগত সমর্থন চান তিনি। জবাবে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ এই বহুপাক্ষিক ফোরামগুলোতে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেন।

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে সফলভাবে জ্বালানি লোডিং শেষ হওয়ায় রাশিয়া সরকারকে ধন্যবাদ জানান ড. খলিলুর রহমান। একই সাথে তিনি নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রটির দ্বিতীয় ইউনিট দ্রুত চালু করতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।

শ্রমবাজার ও মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রসঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় আরও দক্ষ জনশক্তি নিয়োগ এবং তাদের জন্য নিরাপদ কর্মসংস্থানের পরিবেশ নিশ্চিতকরণের বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে বর্তমানে অপেক্ষমাণ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও চুক্তিগুলো দ্রুত সম্পন্ন করার ওপর জোর দেওয়া হয়, যার মধ্যে রয়েছে নাগরিক পুনঃগ্রহণ (রিডমিশন) চুক্তি এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন সংক্রান্ত চুক্তি। এছাড়া, বর্তমানে রাশিয়ায় আটকে থাকা কয়েকজন বাংলাদেশি নাগরিককে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়েও রুশ সরকারের জরুরি সহযোগিতা কামনা করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ল্যাভরভ এ বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে পূর্ণ বিবেচনার আশ্বাস দেন।

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিকদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। এই সংকটের একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধান খুঁজে বের করতে রাশিয়া সক্রিয় সহযোগিতা করতে আগ্রহী বলে নিশ্চিত করেন সের্গেই ল্যাভরভ।

মস্কো সফরে আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান খলিলুর রহমান। এই সফরের মধ্য দিয়ে ঢাকা-মস্কো কৌশলগত ও কূটনৈতিক সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ