ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ২৩৫, ব্যাপক মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা

ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ২৩৫, ব্যাপক মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পের পর দেশটির সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২৩৫ জন। এ ছাড়া আহত মানুষের সংখ্যা ৪ হাজার ৩০০ ছাড়িয়ে গেছে। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অনবরত আফটারশকের কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ভূমিধস ও ভবন ধসের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ভেনেজুয়েলার উত্তরের উপকূলীয় রাজ্য লা গুইরায়। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো জানিয়েছেন, লা গুইরা রাজ্যে শতাধিক বহুতল ভবন ও ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। এতে প্রায় ৭০ হাজারের বেশি পরিবার চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। উপদ্রুত এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং উদ্ধার অভিযান জোরদার করতে সরকার ইতোমধ্যে নিয়োজিত উদ্ধারকর্মীর সংখ্যা ৪ হাজার ২০০ থেকে বাড়িয়ে ১১ হাজার ৫০০ জনে উন্নীত করেছে।

ভূমিকম্পের তীব্রতায় স্থানীয় হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো আহত রোগীতে পূর্ণ হয়ে গেছে। অনেক স্থানেই ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী আসায় চিকিৎসা সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকেরা। এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় ধসে পড়া এলাকাগুলোর কাছাকাছি জরুরি ভিত্তিতে ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করে আহতদের প্রাথমিক ও জরুরি চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে।

ভেনেজুয়েলা সরকারের পক্ষ থেকে দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করা হলেও উদ্ধার কার্যক্রমে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা দেখা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশটির দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক মন্দা, প্রয়োজনীয় আধুনিক সরঞ্জামের অভাব এবং দক্ষ চিকিৎসক ও প্রকৌশলীর ঘাটতির কারণে উদ্ধার অভিযান আশানুরূপ গতি পাচ্ছে না। যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর বিপর্যয় নেমে আসায় অনেক উপদ্রুত এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেট এবং বিদ্যুৎ সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ফলে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা ব্যক্তিদের অবস্থান নির্ণয় করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ অভিযোগ করেছেন, প্রত্যন্ত এবং বিদ্যুৎহীন এলাকাগুলোতে এখনো উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারেনি, যার ফলে অনেক পরিবার এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচেই আটকা পড়ে আছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী কার্লোস আলভারাডো রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে জানিয়েছেন, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে অনেক আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তারা প্রাণ হারাচ্ছেন। এই ভয়াবহ মানবিক সংকটে ভেনেজুয়েলার পাশে দাঁড়িয়েছে প্রতিবেশী দেশ কলম্বিয়া। দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম দফায় ৬২ জন দক্ষ উদ্ধারকর্মী এবং বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সার্চ ডগের একটি দল ভেনেজুয়েলার উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছে। কলম্বিয়া প্রশাসন জানিয়েছে, পরবর্তী ফ্লাইটে ভারী উদ্ধার সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী দুর্যোগ কবলিত এলাকায় পাঠানো হবে।

আন্তর্জাতিক ভূবিজ্ঞানীদের মতে, দুর্গম পাহাড়ি ও নৌপথনির্ভর অঞ্চলগুলোতে উদ্ধারকারীরা সময়মতো পৌঁছাতে না পারলে পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হতে পারে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, অনবরত আফটারশক বা অনুকম্পনের কারণে দুর্বল হয়ে পড়া ভবনগুলো ধসে পড়ছে, যা উদ্ধারকারীদের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, নিখোঁজদের উদ্ধার করা সম্ভব না হলে চূড়ান্ত নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দুর্যোগপূর্ণ এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চেয়েছে ভেনেজুয়েলা সরকার। দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, সার্বিক সংকট নিরসনে তিনি জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা করেছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছেন এবং জরুরি উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করতে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে কাজে লাগিয়ে পূর্ণ মানবিক ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক রেডক্রসও দেশটিতে জরুরি ত্রাণ ও উদ্ধার সহায়তার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ