মোবাইল প্রযুক্তিতে ভূমিকম্পের আগাম সতর্কতা: বৈশ্বিক দুর্যোগ মোকাবিলায় নতুন দিগন্ত

মোবাইল প্রযুক্তিতে ভূমিকম্পের আগাম সতর্কতা: বৈশ্বিক দুর্যোগ মোকাবিলায় নতুন দিগন্ত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

সাম্প্রতিক সময়ে ক্যালিফোর্নিয়া, ভেনেজুয়েলা এবং জাপানে আঘাত হানা বেশ কিছু শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রযুক্তির ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। চলতি জুন মাসের শুরুতে ফিলিপাইনের মিন্দানাও অঞ্চলে সংঘটিত একটি ভূমিকম্পে ৩৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। তবে এই ধরনের বড় দুর্যোগের মুহূর্তেও লাখ লাখ মানুষের মুঠোফোনে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা পৌঁছে যাওয়ায় তারা নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য অতি মূল্যবান কয়েক সেকেন্ড সময় পাচ্ছেন, যা জীবন রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, জাপান, তুরস্ক, রোমানিয়া, চীন, ইতালি ও তাইওয়ানের মতো সুনির্দিষ্ট কিছু দেশে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকম্প আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। তবে বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই এখনো এমন কোনো জাতীয় অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।

সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় রিখটার স্কেলে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, যা গত এক শতাব্দীর মধ্যে দেশটিতে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ভেনেজুয়েলায় কোনো জাতীয় আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা না থাকলেও, মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগলের ‘অ্যান্ড্রয়েড আর্থকোয়েক অ্যালার্ট সিস্টেম’-এর কারণে সেখানকার বহু নাগরিক ভূকম্পন অনুভূত হওয়ার কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট আগেই সতর্কবার্তা পেয়ে যান।

কারাকাসের বাসিন্দা ৩৯ বছর বয়সী লেখক পেরিক্লিস সানচেজ জানান, ভূকম্পন তার এলাকা পর্যন্ত পৌঁছানোর কয়েক মিনিট আগে মুঠোফোনে সতর্কবার্তা পাওয়ায় তিনি দ্রুত ঘর থেকে বের হতে পেরেছিলেন। অন্যদিকে, কলম্বিয়ার বোগোটায় বসবাসকারী ভেনেজুয়েলার প্রবাসী ডায়োজেনেস লোপেজ জানান, তার ফোনে আসা সতর্কবার্তা এবং মানচিত্রের মাধ্যমে তিনি নিজ দেশের ভূমিকম্পের তীব্রতা সম্পর্কে তাৎক্ষণিক জানতে পারেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, চিলি বা জাপানের মতো দেশের নাগরিকদের ভূমিকম্পের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকলেও, ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের জন্য এই প্রযুক্তিগত সতর্কতা অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সতর্কীকরণ ব্যবস্থাটি মূলত মানুষের মোবাইল ফোনের ভেতরে থাকা সেন্সর (অ্যাক্সেলেরোমিটার) থেকে তথ্য সংগ্রহ করে কাজ করে। বার্কলে সিসমোলজি ল্যাবের পরিচালক রিচার্ড অ্যালেন জানান, ২০২০ সালে চালুর পর থেকে এই ব্যবস্থার পরিধি ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। শুরুর দিকে যেখানে ২৫ কোটি মানুষ এই সুবিধার আওতায় ছিল, বর্তমানে তা ২৫০ কোটি ছাড়িয়েছে। প্রতি মাসে গড়ে ৬০টি ভূমিকম্পের সতর্কতা প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ফোনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাঠানো হচ্ছে।

ভূমিকম্পের সময় মূলত কয়েক ধরনের তরঙ্গ বা ঢেউ তৈরি হয়। এর মধ্যে ‘পি-ওয়েভ’ (P-wave) বা প্রাথমিক তরঙ্গ সবচেয়ে দ্রুত ছড়ায় এবং তুলনামূলক ছোট কম্পন সৃষ্টি করে। এরপর আসে ‘এস-ওয়েভ’ (S-wave), যা ধীরগতির হলেও বড় ধরনের বিপজ্জনক ঝাঁকুনি তৈরি করে। সবার শেষে আসে সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ‘এল-ওয়েভ’ (L-wave)। অ্যান্ড্রয়েড ফোনের সেন্সর যখন প্রথম ‘পি-ওয়েভ’ শনাক্ত করে, তখন তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে গুগলের সার্ভারে সংকেত পাঠায়। গুগল দ্রুততম সময়ে ওই এলাকার অন্যান্য ফোনের তথ্য যাচাই করে একটি নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধের ব্যবহারকারীদের কাছে সতর্কবার্তা পাঠিয়ে দেয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই প্রযুক্তির ভিন্ন ভিন্ন প্রয়োগ রয়েছে। যেমন—যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে ইউএসজিএস ‘শেকঅ্যালার্ট’ নামের একটি সমন্বিত ব্যবস্থা পরিচালনা করে, যা ক্যালিফোর্নিয়া, ওরেগন ও ওয়াশিংটনে বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে কাজ করে। সংস্থাটির বিজ্ঞানী রবার্ট ডি গ্রুট জানান, সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের সময় এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ৪০ লাখেরও বেশি মানুষকে সতর্ক করা হয়েছিল। দুর্যোগের পূর্বাভাস পাওয়ার একাধিক উৎস থাকা নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য সবসময় ইতিবাচক বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৯১ সালে মেক্সিকোতে বিশ্বের প্রথম সাধারণ মানুষের জন্য ভূমিকম্পের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু হয়। বর্তমানে মেক্সিকো সিটিতে নিয়মিত বিরতিতে ভূমিকম্প মোকাবিলার মহড়াও অনুষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে, ২০১১ সালে ৯.০ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামির পর জাপান তাদের সতর্কীকরণ ব্যবস্থা সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত সম্প্রসারিত করেছে। ওই ঐতিহাসিক দুর্যোগে দেশটিতে ২২ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন এবং ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটেছিল। বর্তমানে জাপানের সমুদ্রতলদেশীয় এই আধুনিক ব্যবস্থা (S-Net) ভূমিকম্পের সতর্কতা ২০ সেকেন্ড এবং সুনামির সতর্কতা ২০ মিনিট আগে দিতে সক্ষম।

তবে এই প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জানান, যারা ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের (এপিসেন্টার) সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থান করেন, তারা সতর্কবার্তা পাওয়ার জন্য সবচেয়ে কম সময় পান। অনেক সময় মূল কম্পন শুরু হওয়ার আগে তাদের কাছে অ্যালার্ট পৌঁছানো সম্ভব হয় না। তবে উৎপত্তিস্থল থেকে যারা কিছুটা দূরে অবস্থান করেন, তারা জীবন ও সম্পদ রক্ষামূলক প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য কয়েক সেকেন্ড বা মিনিট বেশি সময় পেয়ে থাকেন, যা আধুনিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ