অপরাধ ডেস্ক
ইউরোপের দেশ ইতালিতে গিয়ে পরিবারের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন মাদারীপুর সদর উপজেলার পূর্ব রাস্তি গ্রামের হেমায়েত মোল্লা (২৮)। তবে সেই স্বপ্ন এখন এক চরম দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। সরাসরি ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্র হেমায়েতকে লিবিয়ায় নিয়ে আটকে রাখে এবং তাঁর পরিবারের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। বর্তমানে হেমায়েত নিখোঁজ রয়েছেন এবং তাঁর কোনো সন্ধান পাচ্ছে না পরিবার। এ ঘটনায় মাদারীপুর মানবপাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়েরের তিন মাস অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
আদালত ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর সদর উপজেলার পূর্ব রাস্তি গ্রামের মতিন মোল্লার ছেলে হেমায়েত মোল্লা দীর্ঘদিন ধরে বেকার ছিলেন। এই সুযোগে তাকে সরাসরি ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখায় একটি সংঘবদ্ধ দালাল চক্র। উন্নত জীবনের আশায় হেমায়েতের পরিবার জমিজমা বিক্রি, আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে ধার-দেনা করে বিভিন্ন ধাপে মোট ২২ লাখ ৭৩ হাজার ৩০০ টাকা দালালের হাতে তুলে দেয়। তবে আসামিরা তাকে ইতালিতে না পাঠিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যায়।
এজহারে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে হেমায়েতকে লিবিয়ায় আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হয় এবং বাংলাদেশে তাঁর পরিবারের কাছ থেকে নগদ অর্থ, ব্যাংক হিসাব ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের (বিকাশ) মাধ্যমে ধাপে ধাপে ওই অর্থ আদায় করা হয়। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর থেকেই হেমায়েতের সঙ্গে পরিবারের সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের শেষের দিকে লিবিয়ায় অবস্থানরত কিছু সূত্রের মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে, নির্মম নির্যাতনের কারণে হেমায়েত মারা গেছেন। তবে সরকারি কোনো নথি বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ না থাকায় পরিবার এখনও তাঁর প্রকৃত পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি।
এই ঘটনায় হেমায়েতের ভাই বেলায়েত মোল্লা বাদী হয়ে গত ১৬ মার্চ মাদারীপুর মানবপাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিরা হলেন—সদর উপজেলার লক্ষীগঞ্জ গ্রামের হেদায়েত লস্কর, আলো বেগম, মোতালেব লস্কর এবং ঝিকরহাটি গ্রামের আজাদ দর্জি ও পলি আক্তার।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, মামলা দায়েরের তিন মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও তাদের গ্রেফতারে কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। ফলে বিচার পাওয়া নিয়ে চরম হতাশা ও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন মামলার বাদীসহ হেমায়েতের স্বজনরা। তারা দ্রুত আসামিদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মাদারীপুরসহ দেশের কয়েকটি জেলাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। গ্রামীণ অঞ্চলের সহজ-সরল ও বেকার যুবকদের ইউরোপের উন্নত জীবনের লোভ দেখিয়ে এই চক্রগুলো প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে লিবিয়া বা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে বহু যুবকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। স্থানীয় বাসিন্দারা এই ধরনের দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ও নিয়মিত অভিযানের দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মামলার আসামিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে বা গণমাধ্যমের সামনে আসতে রাজি হননি।
সার্বিক বিষয়ে মাদারীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, মাদারীপুর জেলাটি মানবপাচারপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় এ ধরনের অপরাধ দমনে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। নিখোঁজ যুবকের ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। মামলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশ তৎপর রয়েছে।


