জাতীয় ডেস্ক
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় অংশ নিতে তেহরানের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছেন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে একটি বিশেষ ফ্লাইটে তিনি ইরানের রাজধানী তেহরানের উদ্দেশে রওনা হন। জানাজা ও সংশ্লিষ্ট আনুষ্ঠানিকতা শেষে আগামী ৪ জুলাই স্পিকারের দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। তার এই আকস্মিক মৃত্যুতে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী এই নেতার জানাজায় অংশ নিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, কূটনৈতিক প্রতিনিধি এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বর্তমানে তেহরানে সমবেত হচ্ছেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি হিসেবে স্পিকারের এই সফরকে দুই দেশের কূটনৈতিক ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিতে তিনি অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হন। ১৯৭৯ সালে ইরানে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে সংঘটিত ইসলামী বিপ্লবের পর দেশটির পরিবর্তিত শাসনব্যবস্থা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় খামেনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নীতি-নির্ধারণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। রাষ্ট্র গঠনে তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের কারণে তিনি দ্রুত দেশটির প্রথম সারির নেতায় পরিণত হন।
বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে ইরানের সামরিক ও প্রশাসনিক পুনর্গঠনেও তিনি বিশেষ অবদান রাখেন। ১৯৮০ সালে তিনি কিছু সময়ের জন্য ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পালন করেন। এরপর ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরু হলে তিনি রণকৌশল নির্ধারণ এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা নেন। যুদ্ধকালীন এই সংকটের মধ্যেই তিনি ইরানের ইসলামী বিপ্লবী বাহিনীর (আইআরজিসি) তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পান এবং পরবর্তীতে জনগণের ভোটে ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি পুনর্গঠনে মনোযোগ দেন।
১৯৮৯ সালে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মহানায়ক আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর দেশটির সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম ‘বিশেষজ্ঞ পরিষদ’ (অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস) সর্বসম্মতভাবে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা (সুপ্রিম লিডার) হিসেবে নির্বাচিত করে। সেই থেকে দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ইরানের রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। তার শাসনামলে ইরান পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও আঞ্চলিক নানা ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হলেও তিনি দৃঢ়তার সাথে দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছিলেন।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুতে ইরান এক গভীর নেতৃত্বের শূন্যতায় পড়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে ইরানের চলমান দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত এই ঘটনার পর আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের স্পিকারের তেহরান সফর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। মুসলিম দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার যে রাষ্ট্রীয় নীতি বাংলাদেশের রয়েছে, এই সফর তারই একটি অংশ।


