তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক
দেশে ডিজিটাল বৈষম্য নিরসন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় তথ্যপ্রযুক্তির সেবা পৌঁছে দিতে সাশ্রয়ী মূল্যে স্মার্টফোন সরবরাহের বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, সর্বনিম্ন আড়াই হাজার টাকার মধ্যে প্রয়োজনীয় ফিচারসহ স্মার্টফোন সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী স্মার্টফোন ব্যবহারের সুবিধার বাইরে থাকায় ডিজিটাল সেবার সুফল পূর্ণাঙ্গভাবে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না—এমন প্রেক্ষাপটেই এই নতুন কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে ‘নতুন টেলিকম পলিসি: উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর টেলিকম ও আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এ তথ্য জানান। দেশের টেলিকম ও প্রযুক্তি খাতের সাংবাদিকদের সংগঠন আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে রেহান আসিফ আসাদ বলেন, বাংলাদেশের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ এখনও স্মার্টফোন ব্যবহার করেন না। এটি ডিজিটাল সেবা বিস্তারের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা। সরকারি ও বেসরকারি অধিকাংশ নাগরিক সেবা এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরিত হয়েছে। কিন্তু ডিভাইসের উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ মানুষ সেই সেবা গ্রহণে পিছিয়ে পড়ছে। সরকার এই বাধা দূর করতে চায়। আমরা এমন একটি ভ্যালু চেইন তৈরির চেষ্টা করছি যাতে মাত্র আড়াই হাজার টাকায় একটি স্মার্টফোন বাজারজাত করা সম্ভব হয়। এতে সাধারণ মানুষের নাগালে প্রযুক্তি পৌঁছাবে এবং সামগ্রিকভাবে দেশে ডিজিটাল অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাবে।
উপদেষ্টা আরও উল্লেখ করেন, স্মার্টফোন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অন্যতম হাতিয়ার। যদি স্মার্টফোন সহজলভ্য করা যায়, তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা নিতে পারবে এবং সাধারণ মানুষ ঘরে বসেই ব্যাংকিং ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে পারবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার মোবাইল ডিভাইসের বর্তমান কর কাঠামো পর্যালোচনা করছে। ডিভাইসের উৎপাদন খরচ কমানো এবং আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় সংযোজন শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী বলেন, একটি আধুনিক টেলিকম পলিসির মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা আমাদের অগ্রাধিকার। ইন্টারনেটের দাম কমানোর পাশাপাশি ব্যবহারযোগ্য ডিভাইসের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা না গেলে ডিজিটাল রূপান্তর অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। বিটিআরসি সকল অংশীজনের সাথে সমন্বয় করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালার দিকে এগোচ্ছে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রযুক্তিবিদ সুমন আহমেদ সাবির। তিনি দেশের বর্তমান প্রযুক্তি অবকাঠামো এবং গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডের সাথে তাল মিলিয়ে নতুন টেলিকম পলিসির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শুধু ডিভাইস সস্তা করলেই হবে না, ব্যান্ডউইথ ব্যবহারের সহজলভ্যতা এবং নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক নিশ্চিত করাও জরুরি।
মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে খাত সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা বলেন, আড়াই হাজার টাকায় স্মার্টফোন সরবরাহের উদ্যোগটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। তবে এটি বাস্তবায়নে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড় এবং স্থানীয় পর্যায়ে অ্যাসেম্বলিং প্ল্যান্টগুলোকে আরও প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন। ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি)-এর সভাপতি এম এ হাকিম বলেন, স্মার্টফোনের সংখ্যা বাড়লে ইন্টারনেটের চাহিদাও বাড়বে, যা তৃণমূল পর্যায়ে ব্রডব্যান্ড প্রসারে সহায়ক হবে। মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন এমটব-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়, সাশ্রয়ী ডিভাইসের পাশাপাশি ভয়েস ও ডেটা ব্যবহারের খরচ কমিয়ে আনতে সরকার ও অপারেটরদের যৌথভাবে কাজ করতে হবে।
বক্তারা আরও মনে করেন, ফাইভ-জি প্রযুক্তির যুগে প্রবেশের এই সময়ে দেশের একটি বড় অংশ যদি এখনও ফিচার ফোনের ওপর নির্ভরশীল থাকে, তবে প্রযুক্তির সুফল একপাক্ষিক হয়ে পড়বে। সাশ্রয়ী স্মার্টফোন প্রকল্পটি সফল হলে তা দেশের জিডিপিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাধারণ মানুষকে সক্ষম করে তুলবে। অনুষ্ঠানে ফাইবার এট হোমের চেয়ারম্যান মইনুল হক সিদ্দিকীসহ খাত বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। পুরো আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক সংগঠনের সভাপতি।


