আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান নৌ অবরোধ ও পণ্যবাহী জাহাজ জব্দের ঘটনা নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন নৌবাহিনীর সাম্প্রতিক কার্যক্রমকে ‘জলদস্যুর মতো আচরণ’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি একে একটি ‘লাভজনক ব্যবসা’ বলে বর্ণনা করেছেন। ট্রাম্পের এমন বক্তব্যে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে, যা চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় এক জনসভায় দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প জানান, সম্প্রতি মার্কিন বাহিনী একটি বিদেশি জাহাজ জব্দ করেছে। অভিযানের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমরা জাহাজটি দখল করেছি, এর পণ্য ও তেল নিয়েছি। এটি অত্যন্ত লাভজনক একটি ব্যবসা। আমরা অনেকটা জলদস্যুর মতো কাজ করছি, তবে আমরা কোনো খেলা খেলছি না।”
দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের কৌশলের অংশ হিসেবে দেশটির বন্দর ত্যাগ করা বিভিন্ন জাহাজ, বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেলবাহী ট্যাংকার ও কনটেইনার জাহাজ জব্দ করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের দাবি, এসব পদক্ষেপ তেহরানের আয়ের উৎস বন্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয়। তবে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টের মুখে বাহিনীর এই কর্মকাণ্ডকে ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করাকে নজিরবিহীন ও অপেশাদার হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সংঘাতের প্রেক্ষাপট ও চলমান অস্থিরতা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান অভিমুখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। ওই হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি থাকা দেশগুলোতে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। পাল্টাপাল্টি এই সংঘাতের রেশ ধরে ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাধারণ নৌযান চলাচল সীমিত করে দেয়। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রধান বন্দরগুলোর ওপর কঠোর নৌ অবরোধ আরোপ করে।
জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক প্রভাব
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই ছায়াযুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। বিশ্বের মোট ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ পারস্য উপসাগরের এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই পথে চলাচলে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর নতুন করে মন্দার চাপ সৃষ্টি করছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নৌপথের এই অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সমালোচনা
ট্রাম্পের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাব এবং অসংলগ্ন মন্তব্য নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই জনসমর্থন কমতে শুরু করেছে। বিশেষ করে গত মাসে ইরানের ‘সম্পূর্ণ সভ্যতা ধ্বংস’ করার যে হুমকি ট্রাম্প দিয়েছিলেন, তা বৈশ্বিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। অনেক মার্কিন আইন বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মনে করেন, ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার হুমকি আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এটি সম্ভাব্য ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক ‘জলদস্যুতা’ সংক্রান্ত মন্তব্যটি বিরোধী শিবির ও মিত্র দেশগুলোর মাঝেও অস্বস্তি তৈরি করেছে। তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অভিযানকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করা মার্কিন সামরিক বাহিনীর নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানোর কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। একদিকে ইরানের অনমনীয় অবস্থান এবং অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর ও বিতর্কিত সব পদক্ষেপ এই অঞ্চলকে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অবিলম্বে উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানালেও সমুদ্রপথে জব্দ ও পাল্টা জব্দের রাজনীতি উত্তেজনা প্রশমনের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।


