ইউএস-ইরান যুদ্ধাবসান চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত: ট্রাম্পের দাবি, কূটনৈতিক তৎপরতা তুঙ্গে

ইউএস-ইরান যুদ্ধাবসান চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত: ট্রাম্পের দাবি, কূটনৈতিক তৎপরতা তুঙ্গে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যে চলমান ত্রিদেশীয় যুদ্ধাবসানের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দীর্ঘ কূটনৈতিক অচলাবস্থা ও সামরিক উত্তেজনার পর এই ঘোষণা বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। শনিবার (২৩ মে) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই এই অগ্রগতির কথা নিশ্চিত করেছেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই সম্ভাব্য চুক্তির অন্যতম প্রধান এবং তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হলো দীর্ঘ চার মাস ধরে অবরুদ্ধ ও বন্ধ থাকা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ পুনরায় উন্মুক্ত করা। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের এই প্রধান রুটটি খুলে দেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হলেও পুরো চুক্তিটির আনুষ্ঠানিক বাস্তবায়ন এখনো মার্কিন ও ইরানি আলোচক এবং মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। ট্রাম্প তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন, চুক্তির মূল বিষয়গুলো নিয়ে ইতোমধ্যে বড় ধরনের সমঝোতা হয়েছে এবং বর্তমানে এর চূড়ান্ত খুঁটিনাটি ও আইনি দিকগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে, যা শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।

এই গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ঘোষণার পূর্বে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের একাধিক প্রভাবশালী দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে দফায় দফায় টেলিফোনে কথা বলেন। হোয়াইট হাউস সূত্রে জানা গেছে, ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে পৃথকভাবে একটি ফলপ্রসূ আলোচনা করেছেন। এর পাশাপাশি তিনি কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, মিশর, জর্ডান ও বাহরাইনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও ফোনালাপ করেন। এই ফোনালাপগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর বিমান হামলার মাধ্যমে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে এই প্রত্যক্ষ যুদ্ধ শুরু হয়। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নানামুখী চাপ এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এরপর থেকে বড় ধরনের কোনো সামরিক সংঘাত বা বিমান হামলা না হলেও এই অঞ্চলে এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধ ও অর্থনৈতিক অবরোধ বিরাজ করছে। বর্তমানে মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের প্রধান বন্দরগুলো অবরুদ্ধ করে রেখেছে, যার জবাবে ইরানও আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনী হরমুজ প্রণালী দিয়ে সব ধরনের জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। এই পাল্টাপাল্টি অবরোধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট নিরসনে দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু শক্তিধর দেশ পাকিস্তান শুরু থেকেই অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ সম্প্রতি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তাঁর দেশ উভয় পক্ষের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনতে নিবিড়ভাবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তেহরানে পাকিস্তানি ও কাতারি প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইরানি কর্মকর্তাদের বৈঠকের পর একটি সংশোধিত প্রস্তাব ওয়াশিংটনের কাছে পাঠানো হয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন যে, সমঝোতার পরবর্তী চূড়ান্ত ধাপের আলোচনাটি অত্যন্ত দ্রুত ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হতে পারে।

রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধাবসানের এই প্রক্রিয়াটি প্রায় চূড়ান্ত হলেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এখনো তিনটি প্রধান এবং জটিল বাধা রয়েছে। প্রথমত, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সীমা নির্ধারণ। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত অঞ্চলগুলোতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি এবং সেনা প্রত্যাহারের সময়সীমা। এবং তৃতীয়ত, আমেরিকার ব্যাংকে দীর্ঘকাল ধরে আটকে থাকা ইরানের প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের জব্দকৃত অর্থ অবমুক্তি ও তেহরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।

একদিকে মার্কিন প্রশাসন যখন চুক্তির বিষয়ে অত্যন্ত আশাবাদী, অন্যদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো কিছুটা সতর্ক অবস্থান দেখাচ্ছে। ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমগুলোর দাবি, হরমুজ প্রণালীতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হলেও এর সার্বিক নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা তেহরানের একক এখতিয়ারেই থাকবে। এই দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক মতপার্থক্যের অবসান ঘটিয়ে চূড়ান্ত চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিরই অবসান ঘটাবে না, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্য রুটের নিরাপত্তায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ