আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইউরোপের অন্যতম ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ফ্রান্সে কঠোর আইনি কাঠামো, স্বাস্থ্যবিধি এবং প্রশাসনিক নজরদারির মধ্য দিয়ে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হচ্ছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য মুসলিমপ্রধান দেশের মতো ফ্রান্সে উন্মুক্ত স্থানে বা বাসাবাড়িতে পশু কোরবানির সুযোগ নেই। দেশটির প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কেবল সরকার অনুমোদিত কসাইখানা ও বিশেষ জবাইকেন্দ্রে কোরবানি সম্পন্ন করতে হয়।
ফ্রান্সের সাংবিধানিক কাঠামোয় ধর্মীয় স্বাধীনতা স্বীকৃত হলেও জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশগত সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। প্রতিবছর ঈদুল আজহার পূর্বে দেশটির কৃষি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অঞ্চলভিত্তিক অনুমোদিত জবাইকেন্দ্রের তালিকা প্রকাশ করে। স্থানীয় প্রশাসন, কেন্দ্রীয় মসজিদ ও বিভিন্ন ইসলামিক সংগঠন যৌথভাবে এ কার্যক্রম সমন্বয় করে। রাজধানী প্যারিসের ঐতিহাসিক ‘গ্রঁদ মস্কে দ্য প্যারিস’ এবং লিওঁ শহরের ‘গ্রঁদ মস্কে দ্য লিওঁ’ স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে বৈধভাবে কোরবানি সম্পাদন ও হালাল বিধান নিশ্চিতকরণে তদারকি করে। রোন অঞ্চলে ধর্মীয় বিধান প্রতিপালনে ‘আরজিএমএল’ নামক হালাল সনদ প্রদানকারী সংস্থা কাজ করছে। এছাড়া মার্সেই, তুলুজ, লিল এবং স্ত্রাসবুর্গসহ প্রধান শহরগুলোতে ঈদের অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে স্থায়ী কসাইখানার পাশাপাশি অস্থায়ী জবাইকেন্দ্রের ব্যবস্থা করা হয়।
ফরাসি আইন অনুযায়ী, অনুমোদিত কসাইখানার বাইরে বা নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে পশু জবাই করা একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। এ আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড এবং ১৫ হাজার ইউরো জরিমানার বিধান রয়েছে। অবৈধ জবাই রোধে ঈদের দিনগুলোতে স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসন বিশেষ নজরদারি ও অভিযান পরিচালনা করে। নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট খামার থেকে পশু সংগ্রহ করতে হয় এবং পরিবহনের ক্ষেত্রেও কঠোর নীতিমালা অনুসরণ করতে হয়। এছাড়া, জবাইয়ের সময় সরকার স্বীকৃত প্রশিক্ষিত কর্মীর উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
দেশটিতে কোরবানিকে কেন্দ্র করে আইনি ও সামাজিক বিতর্কও বিদ্যমান। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় প্রাণী অধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, জবাইয়ের পূর্বে পশুকে অজ্ঞান করা বাধ্যতামূলক করা উচিত। বিপরীতে, মুসলিম সংগঠনগুলোর অবস্থান হলো—ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী কোরবানি করা তাদের মৌলিক অধিকারের অংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২০০৯ সালের আইন অনুযায়ী সাধারণ জবাইয়ের ক্ষেত্রে পশুকে অজ্ঞান করার নিয়ম থাকলেও, ধর্মীয় কারণে হালাল ও কোশার পদ্ধতির জন্য ফ্রান্স বিশেষ ছাড় বহাল রেখেছে। ২০২০ ও ২০২১ সালের সরকারি নির্দেশনায় এই ধর্মীয় ছাড় পুনর্নিশ্চিত করা হলেও স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা বিধি আরও কঠোর করা হয়েছে।
আইনি অনুমতি থাকা সত্ত্বেও ফ্রান্সে বসবাসরত মুসলিম সম্প্রদায় প্রতিবছরই ব্যবহারিক কিছু সংকটের মুখোমুখি হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো স্থায়ী ও অস্থায়ী কসাইখানার অপ্রতুলতা। উদাহরণস্বরূপ, গার্দ বিভাগে পুরো মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য মাত্র একটি অস্থায়ী জবাইকেন্দ্র অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, যা ভেস্ত্রিক-এ-কাঁদিয়াক এলাকায় বিভাগীয় জনসংখ্যা সুরক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত হয়।
দ্বিতীয় প্রধান সংকটটি অর্থনৈতিক। কোরবানির মৌসুমে চাহিদার তুলনায় পশুর সরবরাহ সীমিত থাকায় দাম কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। বছরের শুরুতে যে ভেড়ার মূল্য প্রায় ৯০ ইউরো থাকে, তা ঈদের সময়ে সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যায়, যা নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবারগুলোকে আর্থিকভাবে চাপে ফেলে। এই পরিস্থিতিতে নিম শহরের ‘লুমিয়ের এ পিয়েতে’ মসজিদসহ বেশ কিছু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সরাসরি পশু কেনার পরিবর্তে অনুমোদিত কসাইখানা থেকে মাংস সংগ্রহের পরামর্শ দিয়ে থাকে।
প্রশাসনিক জটিলতা, সীমিত অবকাঠামো এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের পরও ফ্রান্সে মুসলিম সমাজের কাছে ঈদুল আজহা একটি অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। কোরবানির মাংসের একটি বড় অংশ দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ এবং বিভিন্ন সামাজিক সহায়তা কার্যক্রমের মাধ্যমে এই উৎসবের মূল চেতনা বজায় রাখা হয়। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ফ্রান্সের বর্তমান কোরবানি ব্যবস্থাপনা ইউরোপীয় আইন, জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার মধ্যকার ভারসাম্য ও সামাজিক সহাবস্থানের একটি অন্যতম বাস্তব উদাহরণ।


