নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও পরিধি বিস্তৃতির লক্ষ্যে আরও ১০টি জেলাকে নতুন করে রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশের সব জেলাকে রেল যোগাযোগের সুঁতোয় বাঁধার নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে এই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে রেলওয়ের অবকাঠামো নির্মাণ ও ট্রেন চালুর প্রক্রিয়া গতিশীল করতে এখন থেকে লাইন নির্মাণ, বগি এবং ইঞ্জিন ক্রয়ের কাজ আলাদা প্রকল্পের মাধ্যমে না করে একটি সমন্বিত প্রকল্পের অধীনে সম্পন্ন করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদফতরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সড়ক পরিবহন ও সেতু, নৌপরিবহন এবং রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সরকারের এসব নতুন সিদ্ধান্তের কথা জানান। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ কার্যক্রম, সামগ্রিক কানেক্টিভিটি এবং সেবার মানোন্নয়ন সংক্রান্ত একটি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আলোকেই এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে রেলমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশের ৪৯টি জেলার সঙ্গে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য দেশের সবকটি জেলাকে এই নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসা। এরই ধারাবাহিকতায় প্রথম পর্যায়ে ঢাকার পার্শ্ববর্তী এবং দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ১০টি জেলায় রেল সেবা সম্প্রসারণের জন্য নতুন প্রকল্প গ্রহণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা ও এর আশপাশের জেলাগুলোর মধ্যে দ্রুত যাতায়াতের সুবিধার্থে কমিউটার ট্রেন সার্ভিস চালুর বিষয়ে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, মানিকগঞ্জ জেলার সঙ্গে বর্তমানে কোনো রেল সংযোগ নেই। ঢাকা-মানিকগঞ্জ রুটে নতুন রেললাইন স্থাপন করে কমিউটার ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে মানুষ ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে কর্মক্ষেত্র বা ব্যবসার কাজ শেষ করে দ্রুততম সময়ে নিজ জেলায় ফিরে যেতে পারে। একইভাবে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা-টঙ্গী, জয়দেবপুর ও ঢাকা-নরসিংদী রুটের কানেক্টিভিটি আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে চলমান এবং দূরপাল্লার নতুন প্রকল্পগুলোর বিষয়ে মন্ত্রী উল্লেখ করেন, আখাউড়া-সিলেট এবং সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেলপথ নির্মাণের মতো বড় প্রকল্পগুলোর কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি গাজীপুরের ধীরাশ্রমে একটি আইসিডি (ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো) প্রকল্প ইতিমধ্যে অনুমোদন পেয়েছে, যা দেশের পণ্য পরিবহনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের সেবার মান বাড়াতে এবং যাতায়াতের সময় কমিয়ে আনতে টঙ্গী থেকে আখাউড়া এবং লাকসাম থেকে সিলেট পর্যন্ত বিদ্যমান মিটারগেজ অংশটুকুকে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে রূপান্তর করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর ফলে সমগ্র ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের মিসিং লিংকগুলোর অবসান ঘটবে। এছাড়া, ঢাকা থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত একটি ডিরেক্ট ‘কর্ড লাইন’ নির্মাণের বিষয়েও নীতিগত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। এই কর্ড লাইনটি নির্মিত হলে ঢাকা ও কুমিল্লার মধ্যকার দূরত্বের ব্যবধান প্রায় ৮০ থেকে ৮২ কিলোমিটার কমে আসবে, যা পূর্বাঞ্চলীয় রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক বিশাল যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে।
রেলওয়ের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অতীতের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সমন্বয়হীনতা দূর করতে একটি বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তনের ঘোষণা দেন শেখ রবিউল আলম। তিনি জানান, অতীতে দেখা গেছে রেললাইন নির্মাণ সম্পন্ন হলেও ইঞ্জিন বা বগি সংকটের কারণে বছরের পর বছর ট্রেন চালানো সম্ভব হয়নি। এই ধরনের বিচ্ছিন্ন ও ত্রুটিপূর্ণ উন্নয়ন প্রক্রিয়া থেকে সরকার সম্পূর্ণভাবে বেরিয়ে আসছে। এখন থেকে কোনো প্রকল্পের ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) পাস করার সময়ই সেখানে রেললাইন নির্মাণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় লোকোমোটিভ (রেল ইঞ্জিন) এবং ক্যারেজ (বগি) সংগ্রহের বিষয়টি একই উন্নয়ন প্রস্তাবনার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। প্রকল্প শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যাতে সরাসরি ট্রেন চলাচল শুরু করা যায়, তা নিশ্চিত করতেই এই সমন্বিত প্রকল্প নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে রেলওয়ের সব নতুন প্রজেক্ট এই সমন্বিত নিয়মের আওতায় বাস্তবায়িত হবে, যা রাষ্ট্রীয় অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং জনগণের দ্রুত সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।


