অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
প্রবাসীদের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিতকরণ, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পরিধি বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সেবা সহজতর করার লক্ষ্যে বহুল প্রতীক্ষিত ‘প্রবাসী কার্ড’ চালু করতে যাচ্ছে সরকার। সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের অংশ হিসেবে গৃহীত এই উদ্যোগটি আগামী আগস্ট মাসে পরীক্ষামূলকভাবে কার্যক্রম শুরু করবে। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের নানাবিধ সংকট লাঘব এবং রাষ্ট্রীয় সেবাপ্রাপ্তি সহজ করার উদ্দেশ্যে এই বিশেষ কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসী কার্ডধারীরা দেশে ও বিদেশে অন্তত ১০টি বিশেষ সুবিধা পাবেন। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ক্রীড়া কার্ডের মতো বিশেষ কার্ডগুলো প্রবর্তন করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রবাসীদের জন্য এই কার্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কার্ডটির মাধ্যমে প্রবাসীরা যেসব সুবিধা ভোগ করবেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে কমপ্লিমেন্টারি লাউঞ্জ ব্যবহারের সুবিধা, বিশেষ ইমিগ্রেশন বুথের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে বহির্গমন ও আগমন প্রক্রিয়া সম্পন্নকরণ এবং ‘মিট অ্যান্ড গ্রিট’ সেবা প্রাপ্তি। এছাড়া বিমান টিকিট ও হোটেল বুকিংয়ের ক্ষেত্রে কার্ডধারীরা বিশেষ মূল্যছাড় পাবেন। প্রবাসীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে দেশে-বিদেশে ন্যায্যমূল্যে গাড়ি বুকিং এবং নির্দিষ্ট কার্ডধারীদের জন্য বিমানবন্দর পিক অ্যান্ড ড্রপ সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও কার্ডটি বিশেষ ভূমিকা রাখবে। সরকারি হাসপাতালে প্রবাসীদের জন্য নির্ধারিত সেবা বুথ স্থাপন এবং বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা থাকবে। দুর্ভাগ্যবশত কোনো প্রবাসী কার্ডধারীর মৃত্যু হলে, তাদের মরদেহ বিনা খরচে দেশে পরিবহনের দায়িত্ব নেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এছাড়াও প্রবাসফেরত কর্মীদের টেকসই পুনর্বাসন ও বীমা সুবিধা প্রদানের রূপরেখাও এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কার্ডটির মাধ্যমে প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতাও অনেকটাই নিরসন হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। জমি রেজিস্ট্রেশন, নামজারি, ইউটিলিটি সংযোগ স্থাপন, বিভিন্ন ধরনের লাইসেন্স প্রাপ্তি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কার্ডধারীরা অগ্রাধিকার পাবেন। একইসাথে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), পাসপোর্ট নবায়ন ও কনস্যুলার সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে এই কার্ডটি একটি সহায়কমূলক পরিচয়পত্র হিসেবে কাজ করবে।
আর্থিক সেবার ক্ষেত্রে প্রবাসী কার্ডটি একটি মাইলফলক হতে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে সরাসরি অর্থ প্রেরণ, সহজ লেনদেন, রেমিট্যান্স রিওয়ার্ড পয়েন্ট এবং ক্রেডিট স্কোরিং সুবিধাসহ সহজ শর্তে ঋণ গ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে। ব্যাংকিং খাতের আধুনিকায়নের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহকে আরও গতিশীল ও স্বচ্ছ করতে এই কার্ড কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা।
আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে পরীক্ষামূলকভাবে এই কার্ডের কার্যক্রম শুরু হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে প্রথম পর্যায়ে এই ডেবিট কার্ড ইস্যু করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। সরকারের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে ৫০ হাজার প্রবাসী কার্ড বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর আগামী বছরের জুন মাসের মধ্যে এই সংখ্যা ২ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে কর্তৃপক্ষ।
প্রবাসীদের কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। এই কার্ড প্রবর্তনের মাধ্যমে একদিকে যেমন তাদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতির মূল স্রোতধারায় তাদের অংশগ্রহণ আরও সুসংহত হবে। সংশ্লিষ্ট মহল আশা প্রকাশ করছে, প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করবে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে নতুন গতির সঞ্চার করবে।


