হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ: সাংবিধানিক সংশোধনীতে স্বাক্ষর ও ক্ষমতার পটবদল

হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ: সাংবিধানিক সংশোধনীতে স্বাক্ষর ও ক্ষমতার পটবদল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট তামাস সুলিওক পার্লামেন্টে পাস হওয়া বিতর্কিত সাংবিধানিক সংশোধনীতে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে তার পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। শনিবার সন্ধ্যায় এই স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সম্মতি প্রদান করেন। সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী, এই স্বাক্ষরের পর রোববার মধ্যরাত থেকে তার মেয়াদ চূড়ান্তভাবে শেষ হতে যাচ্ছে।

গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ভিক্টর অরবানের নেতৃত্বাধীন ফিদেস সরকার পরাজিত হয়। এরপর নতুন সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রী পেতের মাগইয়ার নেতৃত্বাধীন তিসা পার্টি। ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তিসা সরকার সুলিওকের বিরুদ্ধে সাবেক সরকারের প্রভাব বজায় রাখার অভিযোগ তোলে। তাদের দাবি, প্রেসিডেন্ট হিসেবে সুলিওক অরবানের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখছেন, যা রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার পরিপন্থী। এই প্রেক্ষাপটে পার্লামেন্টে দ্রুত সাংবিধানিক সংশোধনী পাস করা হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ব্যাপ্তি ও তাকে অপসারণের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা।

সংশোধনীতে স্বাক্ষরের পর তামাস সুলিওক এক বিবৃতিতে বর্তমান সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, এই পদক্ষেপ হাঙ্গেরির আইনের শাসন ও সাংবিধানিক গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় ধাক্কা। সুলিওকের মতে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য একটি মুক্ত সমাজের মৌলিক মূল্যবোধ ও সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে আপস করা হয়েছে। তিনি একে হাঙ্গেরির গণতন্ত্রের জন্য একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বা সন্ধিক্ষণ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

অপরদিকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান এই সাংবিধানিক পরিবর্তনকে ‘স্বৈরাচারী পদক্ষেপ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি এ সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে জনসাধারণের প্রতি রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়েছেন। দীর্ঘ ১৬ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকাকালীন অরবান ও তার দল ফিদেস হাঙ্গেরির বিভিন্ন স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজেদের অনুগত ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচনে পরাজয়ের পরও ওইসব প্রতিষ্ঠানে ফিদেসের প্রভাব বিদ্যমান থাকায় নতুন সরকার রাষ্ট্র পুনর্গঠনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে।

সোমবার পার্লামেন্টে এই সংশোধনী পাস হওয়ার পর তিসা পার্টির ১৪১ জন আইনপ্রণেতা করতালির মাধ্যমে সিদ্ধান্তটিকে স্বাগত জানান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সুলিওকের বিদায় হাঙ্গেরির ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর ফলে নতুন সরকার তাদের সংস্কার কর্মসূচি আরও জোরদার করার সুযোগ পাবে।

হাঙ্গেরির সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান আন্দ্রাস বাকা প্রেসিডেন্টকে অপসারণের এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছেন। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ১৯৮৯ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত হাঙ্গেরিতে যে গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসনের ধারা বিদ্যমান ছিল, অরবানের শাসনামলে তা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ফিদেস সরকার দীর্ঘ সময় ধরে যে কর্তৃত্ববাদী কাঠামো গড়ে তুলেছিল, তা ভেঙে ফেলা বর্তমান সরকারের জন্য একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার অংশ।

সুলিওকের পদত্যাগের পর হাঙ্গেরিতে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া কেমন হবে, তা এখন দেশটির রাজনীতির প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তিসা সরকার কতটুকু সফল হবে, তা নিয়ে এখন নানা মহলে আলোচনা চলছে। এই ঘটনাটি একইসঙ্গে হাঙ্গেরির বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণকেও আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ